Menu
Back to timeline

বাংলাদেশের গ্যাস সংকট: যে বিপর্যয় অনিবার্য ছিল না, কিন্তু শাসনব্যর্থতায় বাস্তব হয়েছে

বাংলাদেশের গ্যাস সংকট: যে বিপর্যয় অনিবার্য ছিল না, কিন্তু শাসনব্যর্থতায় বাস্তব হয়েছে

বাংলাদেশ আজ যে গ্যাস সংকটের মুখোমুখি, তা কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়, কোনো বৈশ্বিক শক্তি-ঝাঁকুনির অনিবার্য পরিণতিও নয়, কিংবা সম্পদের রহস্যময় ঘাটতির ফলও নয়। এটি একেবারেই স্পষ্টভাবে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা—ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত, নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বহীনতার সরাসরি ফল। ‘সংস্কার’-এর বুলি আওড়ে এই সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক খাতকে কার্যত অরাজকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

একটি গভীর শক্তি সংকট দেশের উপর ছায়া ফেলেছে

এই সংকট রাতারাতি সৃষ্টি হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ আরও ভয়াবহ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করেছে এবং তবুও সিস্টেম ভেঙে পড়েনি। কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রাহক অর্থ দিতে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও গ্যাস নেই, এলপিজি আমদানি চললেও সিলিন্ডার বাজারে উধাও, আর সরবরাহ ব্যবস্থায় নেই কোনো শৃঙ্খলা।

এগুলো সম্পদের সংকটের লক্ষণ নয়—এগুলো প্রশাসনিক পক্ষাঘাতের লক্ষণ। শেখ হাসিনার সরকার ঘাটতি আগাম বুঝে এলএনজি আমদানি, ভর্তুকি, এলপিজি ও সিএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করেছিল। আর ইউনূস সরকারের আমলে বাস্তবায়ন কার্যত পরিত্যক্ত। কথার ফুলঝুরি থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ন্যূনতম দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ। ফলাফল—একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা পরিণত হয়েছে জাতীয় জরুরি অবস্থায়।

গ্যাস ব্যবস্থার ধস: একটি কাঠামোগত বিপর্যয়

বাংলাদেশের গ্যাস সংকট এখন আর সাময়িক নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমিক ব্যর্থতা।

ক. সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙন

  • পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত, বিশেষ করে ঢাকায় দীর্ঘ ও অঘোষিত বন্ধ

  • এলপিজি আমদানি চললেও বাজারে ঘাটতি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি

  • সিএনজি স্টেশন বন্ধ বা অনিয়মিত, নগর পরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত

  • শিল্পকারখানায় গ্যাস রেশনিং, উৎপাদন হ্রাস বা বন্ধ

খ. অর্থনীতি ও নগরজীবনে প্রভাব

  • শহরজুড়ে নিয়মিত গ্যাস বিভ্রাট

  • ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্প ও পোশাক খাতে আর্থিক ক্ষতি

  • সিএনজি সংকটে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, যাতায়াতে দুর্ভোগ

২০২৪-এর পর শাসনব্যবস্থার ফাঁকফোকর

২০২৪ সাল থেকেই বাংলাদেশ বাড়তি শক্তি ঝুঁকিতে প্রবেশ করে। প্রয়োজন ছিল দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও কার্যকর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ। কিন্তু ইউনূস সরকার সমস্যাকে জমতে দিয়েছে। ফলে যা ছিল ব্যবস্থাপনাগত চাপ, তা রূপ নিয়েছে পূর্ণাঙ্গ সংকটে।

২০২৪–২৬ সময়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়—

  • দেশীয় গ্যাস উৎপাদন স্থির (২৩০০–২৪০০ এমএমসিএফডি), চাহিদা ৩৫০০ ছাড়িয়ে যায়

  • এলএনজি সরবরাহ কমে যায় অর্থসংকট ও বিলম্বিত সিদ্ধান্তের কারণে

  • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০–২২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে

  • প্রতি এলএনজি কার্গোর জন্য ৬০–৮০ মিলিয়ন ডলার জোগাড় করাই হয়ে পড়ে কঠিন

এর ফলে এলএনজি কেনা অনিয়মিত হয়, সংরক্ষণ পরিকল্পনা বাতিল হয়, আর সংকটের সময় ব্যবহারের জন্য কোনো বাফার গড়ে ওঠেনি।

সংকটের মূল চালকগুলো

  • নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে সম্পূর্ণ স্থবিরতা

  • কয়লা, পারমাণবিক ও বিকল্প জ্বালানিতে কোনো অগ্রগতি নেই

  • এলপিজি বাজারে সিন্ডিকেট, মজুদদারি ও নিয়ন্ত্রণহীন মূল্য

  • আমদানিকারক ও পরিবেশকদের আস্থাহীনতা

সব মিলিয়ে গ্যাস খাত হয়ে উঠেছে ছিদ্রপথে ভরা এক ব্যর্থ ব্যবস্থা।

শেখ হাসিনা বনাম ইউনূস: শাসনের পার্থক্য

শেখ হাসিনার সরকার বৈশ্বিক সংকটেও জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল—

  • কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি (বার্ষিক ~৪০ কার্গো)

  • ওমানসহ উৎস বৈচিত্র্য

  • ছয় বছরে প্রায় ২৬২১৫ কোটি টাকা ভর্তুকি

  • কয়লা ও বিদ্যুৎ খাতে সমন্বিত পরিকল্পনা

  • প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন: পেট্রোবাংলা, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা

অন্যদিকে ইউনূস সরকারের আমলে—

  • সংকট অস্বীকার ও বিলম্ব

  • এলএনজি নীতিতে বিভ্রান্তি

  • এলপিজি ও সিএনজিতে অরাজকতা

  • কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ নেই

  • নীতি নয়, কেবল বক্তৃতা

ফাঁপা সংস্কারের মূল্য

ইউনূস সরকার শুরু থেকেই নিজেকে ‘সংস্কার সরকার’ বলে দাবি করেছে। কিন্তু বাস্তবে গ্যাস খাতে—

  • কোনো প্রকৃত সংস্কার নেই

  • কোনো নতুন অর্থায়ন কাঠামো নেই

  • কোনো বাজার স্থিতিশীলতা নেই

  • কোনো অনুসন্ধান উদ্যোগ নেই

সংস্কার এখানে বাস্তবতা নয়, একটি অজুহাত। আর সেই অজুহাতের মূল্য দিচ্ছে দেশ—শিল্পে মন্দা, মূল্যস্ফীতি, এবং নাগরিক দুর্ভোগের মাধ্যমে।

এই গ্যাস সংকট সংস্কারের খরচ নয়।
এটি সংস্কার না থাকার খরচ।

More from the timeline

View all