Menu
Back to timeline

বাংলাদেশের গভীর সংকট ২০২৫: এক নিম্নমুখী জাতি

বাংলাদেশের গভীর সংকট ২০২৫: এক নিম্নমুখী জাতি

কার্যনির্বাহী সারসংক্ষেপ

বাংলাদেশ আজ এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গভীর সংকটে নিমজ্জিত। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর যে সামরিক-সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে, তারা দেশকে স্থিতিশীল করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র—সবই আজ ধ্বংসের প্রান্তে।

অর্থনৈতিক ধস

  • ২০২৩ সালে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.১%, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ২.৩%-এ।

  • মুদ্রাস্ফীতি ১২% ছাড়িয়েছে; খাদ্যপণ্যে মুদ্রাস্ফীতি ১৬%, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে।

  • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২২ সালের ৩৩ বিলিয়ন ডলার থেকে জুলাই ২০২৫-এ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৪.৫ বিলিয়ন ডলারে।

বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতা

  • যুব বেকারত্ব দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ, ২৮% ছাড়িয়েছে।

  • রেমিট্যান্স প্রবাহ বছরে ১১% হ্রাস পেয়েছে।

  • তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি কমায় ২০ লাখের বেশি শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে।

আইন-শৃঙ্খলার চূড়ান্ত অবনতি

  • ঢাকায় হত্যাকাণ্ড বেড়েছে ২৭% এবং সারাদেশে ২২%।

  • ২০২৫ সালে গণপিটুনির ঘটনা আগের বছরের তুলনায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

  • মাঝ-২০২৪ থেকে এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ৬৫০টিরও বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

জঙ্গিবাদ ও উগ্রপন্থা

  • অক্টোবর ২০২৪ থেকে অন্তত ১৫টি জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

  • গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার যুবক অনলাইনের মাধ্যমে উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়ছে।

অধিকার ও স্বাধীনতার অবক্ষয়

  • অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২০,০০০-এর বেশি মানুষকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

  • গত এক বছরে অন্তত ১৩৫ জন সাংবাদিক হামলা ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন।

  • সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।

লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা

  • ২০২৪ সালের পর থেকে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ৩০%। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

  • সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা দ্বিগুণ হয়েছে; হিন্দু মন্দির ও খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার আক্রমণের শিকার।

বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ধ্বংস, রাজনৈতিক পক্ষাঘাত এবং সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে নিমজ্জিত। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সহ সব দলের অংশগ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ছাড়া এই দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই।


অস্থিরতার এক বছর

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাকে অপসারণের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছে। নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড পুনরুদ্ধার তো দূরের কথা, বরং সব ক্ষেত্রেই অবনতির চিত্র স্পষ্ট।

অর্থনৈতিক ধস, বেকারত্বের বিস্ফোরণ, নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, গণপিটুনি, নির্বিচার আটক ও সাংবাদিকদের উপর দমন-পীড়ন—সব মিলিয়ে দেশ আজ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। বিচার বিভাগ স্বাধীনতা হারিয়েছে, আর রাজনৈতিক স্বাধীনতা কার্যত বিলীন হয়ে গেছে।


প্রবৃদ্ধি থেকে পতন: অর্থনৈতিক মুক্তপতন

বাংলাদেশের অর্থনীতি, যা একসময় দক্ষিণ এশিয়ার সাফল্যের গল্প হিসেবে বিবেচিত হতো, আজ ভেঙে পড়ছে।

  • ২০২৩ সালে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭% এরও বেশি, ইউনুস সরকারের অধীনে তা নেমে এসেছে ৩%-এর নিচে।

  • মুদ্রাস্ফীতি দ্বিগুণ বেড়ে ১২%-এ দাঁড়িয়েছে।

  • তৈরি পোশাক শিল্পে ইতোমধ্যেই দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে।

  • রেমিট্যান্স ও ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রবাহও স্থবির।

যুব বেকারত্ব ৩০% ছাড়িয়ে যাওয়ায় দক্ষ কর্মীরা দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে ‘ব্রেন ড্রেইন’ সংকট তৈরি করবে। অপরাধ, উগ্রপন্থা ও সামাজিক অস্থিরতাও এই বাস্তবতার সরাসরি ফলাফল।


আইন-শৃঙ্খলার বিপর্যয়

২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৯৩০টি হত্যাকাণ্ড রেকর্ড হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬% বেশি। পুলিশ দুর্বল ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

গণপিটুনির মাত্রা ভয়াবহ আকার নিয়েছে—২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ৬৩৭ জন মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন, যেখানে ২০২৩ সালে সংখ্যা ছিল মাত্র ৫১।


নারী নির্যাতন ও সংখ্যালঘুদের উপর হামলার উল্লম্ফন

২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ৪,২০০ ছাড়িয়েছে, এর মধ্যে ৬৫০টিরও বেশি গণধর্ষণ। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় স্থানে হামলার ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।


বিচার বিভাগ রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত

অন্তর্বর্তী সরকার বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে।

  • ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ৫ লক্ষাধিক মানুষকে রাজনৈতিক মামলায় আসামি করা হয়েছে।

  • অধিকাংশই “বেনামী আসামি”, ফলে ইচ্ছামতো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে।

  • আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মীকে সাজানো মামলায় জড়িয়ে রাখা হয়েছে।


বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের উল্লম্ফন

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর নিরাপত্তা বাহিনী অন্তত ৬৫০-এর বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ডজন ডজন কর্মী ও বিরোধী নেতার “গুম” এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।


মানবাধিকার ও স্বাধীনতার অবক্ষয়

স্বাধীন মতপ্রকাশ, গণমাধ্যম ও সংগঠনের অধিকার আজ প্রায় বিলুপ্ত। সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, এমনকি সাধারণ নাগরিকরাও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন নজরদারি ও ভিন্নমত দমনের ফলে দেশজুড়ে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।


একমাত্র পথ: অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন

বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অর্থনৈতিক ধস, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও সামাজিক সহিংসতার মধ্যে একমাত্র মুক্তির পথ হলো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় নির্বাচন।

আন্তর্জাতিক সহায়তা, স্বচ্ছ নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ছাড়া বাংলাদেশকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ এখনও পুনরুদ্ধার হতে পারে—কিন্তু তার জন্য এখনই প্রয়োজন গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

More from the timeline

View all