ঐক্য ও সংস্কৃতির স্বপ্ন
ষোলটি গৌরবময় বছরে বাংলাদেশ প্রস্ফুটিত হয়েছিল এক স্বপ্নে—ঐক্য, মর্যাদা ও সংস্কৃতির গৌরবে ভরা এক স্বপ্নে। সেই স্বপ্নের রূপকার ছিলেন শেখ হাসিনা, যিনি বিশ্বাস করতেন—একটি জাতির প্রকৃত শক্তি কেবল অর্থনীতি বা অবকাঠামোতে নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের স্পন্দনে, তাদের ভাষা, শিল্প, সংগীত ও মানবিক বন্ধনে নিহিত।
তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ কেবল ঐতিহ্য রক্ষা করেনি, বরং দিয়েছে তাকে নতুন জীবন। বাউল গানের সুর, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, লোকোৎসবের রঙিন আনন্দ—সবই আবার ফিরে এসেছে জাতীয় গর্বের প্রতীকে। শেখ হাসিনার বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল এমন এক দেশ, যেখানে ধর্ম ও সংস্কৃতি পাশাপাশি পথ চলেছে, যেখানে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডা একই আকাশের নিচে একটাই বার্তা উচ্চারণ করেছে—
“আমরা সবাই একই মাটির সন্তান।”
উন্নয়নের পথে হেঁটে শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন, আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের যোগই পারে একটি জাতিকে পূর্ণতা দিতে। তিনি আধুনিক বাংলাদেশ গড়েছেন, কিন্তু শিকড়কে কখনো হারাতে দেননি।
সংস্কৃতিতে গর্বিত বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল এক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছিল নতুন প্রাণ, আধুনিকতা ও কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর হয়ে উঠেছিল তারা।
বাউল গান, নজরুলগীতি, নাট্যচর্চা, পল্লী মেলা—সবখানেই ফিরে এসেছিল সৃষ্টির আনন্দ। সরকার শিল্পী, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য নীতি সহায়তা, পুরস্কার ও উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে এক নতুন প্রজন্মের সৃজনশীল বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছিল।
তাঁর নেতৃত্বে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বমঞ্চে। ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে আমাদের ভাষার গৌরব। বিশ্বজুড়ে আয়োজন করা বাংলা উৎসবগুলো প্রমাণ করেছে—বাংলা কেবল ভাষা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রতীক।
যেখানে প্রতিটি ধর্ম পায় সমান মর্যাদা
শুধু সংস্কৃতি নয়, শেখ হাসিনা ধর্মীয় সম্প্রীতিকেও করেছিলেন জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন—একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হয়, যখন তার সব ধর্মের মানুষ শান্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় বসবাস করে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর সরকার নিশ্চিত করে—মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব নাগরিকই সমান অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতা ভোগ করবে।
বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব—ঈদ, দুর্গাপূজা, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা—সবই জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়, যেখানে সবাই অংশ নেয় একে অপরের আনন্দে। প্রতিটি ধর্মীয় উপাসনালয় পায় সরকারি সহায়তা ও নিরাপত্তা। তাঁর এই নীতিতে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয় সম্প্রীতির মডেল রাষ্ট্র—যেখানে বৈচিত্র্যই ঐক্যের অন্য নাম।
তারপর এলো ইউনুস সরকারের অন্ধকার অধ্যায়
কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের পর, যখন ড. মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন সেই উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক আলোর দীপ্তি ক্রমে ম্লান হতে শুরু করে।
যে দেশ একসময় উৎসব, সঙ্গীত ও সৃষ্টিশীলতার উচ্ছ্বাসে মুখর ছিল, সেখানে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা ও ভয়। দেওয়ানবাগ দরবার শরিফে হামলা, মাজারে ভাঙচুর, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হুমকি—এসব ঘটনায় শিল্পী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে গভীর আতঙ্ক।
বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি—যে প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় সৃজনশীলতার কেন্দ্র ছিল, সেগুলো এখন অনিশ্চয়তা ও অবহেলায় আক্রান্ত। শিল্পী, লেখক, সংগীতজ্ঞরা যারা একসময় রাষ্ট্রীয় প্রেরণায় কাজ করতেন, আজ তারা নীরব, আশঙ্কিত—তাদের কথা শোনা হবে কি না, সেই প্রশ্নে তারা অনিশ্চিত।
আরও উদ্বেগের বিষয়—স্কুল পাঠ্যবই থেকে শব্দ, ইতিহাস ও পরিচয় মুছে ফেলা হচ্ছে। ‘আদিবাসী’ শব্দ বাদ দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নরম করে লেখা—এসব পরিবর্তনে ক্ষয় হচ্ছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আত্মা।
শেখ হাসিনার স্বপ্নভঙ্গ: এক সৃজনশীল জাতির নীরবতা
যে বাংলাদেশ একসময় আত্মবিশ্বাসী, সংস্কৃতিপ্রেমী ও ঐক্যবদ্ধ ছিল, আজ তা শঙ্কা ও বিভ্রান্তিতে ভুগছে। উৎসবের দেশ আজ ভয় আর দমননীতির ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনার পরিশ্রমে নির্মিত সেই সংস্কৃতি, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও জাতীয় গর্ব এখন ভঙ্গুর। ইউনুস সরকারের প্রশাসনিক উদাসীনতা ও সংস্কৃতি-বিরোধী মনোভাব জাতির আত্মাকে আঘাত করছে।
তিনি ক্ষমতা নিয়েছেন, কিন্তু কেড়ে নিয়েছেন সেই আলো, সেই প্রাণশক্তি, যা একসময় বাংলাদেশকে আলাদা করে চিনিয়েছে—একটি মানবিক, ঐক্যবদ্ধ ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে।
আজ বাংলাদেশের মানুষ হয়তো প্রশ্ন করছে—
“আমরা কোথায় হারালাম সেই প্রাণের বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ শেখ হাসিনা আমাদের উপহার দিয়েছিলেন?”
কারণ তাঁর বাংলাদেশ ছিল আলোর, গানের, বৈচিত্র্যের—
একটি দেশ, যেখানে সবাই একসূত্রে বাঁধা ছিল—
সংস্কৃতিতে, মানবতায়, আর ভালোবাসায়।