আজ বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি আমরা দেখছি, তাকে কেবল বিশৃঙ্খলা, কাকতালীয় ঘটনা কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রতিদিনের খুন, নারী ধর্ষণের লাগামহীনতা, শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা, ঘরবাড়ি–ব্যবসা–গণমাধ্যম কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এগুলো একটি গভীর ও ভয়াবহ বাস্তবতার লক্ষণ।
এটি অযোগ্যতার কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা নয়।
এটি এমন এক বিশৃঙ্খলা, যা অনুমোদিত, সুরক্ষিত এবং সচেতনভাবে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা সংকট: নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতা
প্রতিদিন বাংলাদেশ রক্তক্ষরণ করছে। আর প্রতিদিন ইউনূস-নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা ভান করছে—সবকিছু নাকি দুর্ঘটনা।
২০২৫ সালেই সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন মানুষ খুন হয়েছে, যা আগের দুই বছরের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে শতাধিক হত্যাকাণ্ড সরাসরি রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত, বিশেষ করে নির্বাচনকেন্দ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে।
এটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের গল্প নয়। এটি পরিসংখ্যানসমর্থিত, ধারাবাহিক সহিংসতার একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন।
ছয় মাসে ১,৯৩০ খুন, ২,৭৪৪ ধর্ষণ: রাষ্ট্র কোথায়?
একই সময়ে দেশের নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে—কখনো বিরল নয়, বরং নিয়মিতভাবে। ভুক্তভোগীরা থানায় গিয়ে পান অবহেলা, দোষারোপ, ভয়ভীতি ও বছরের পর বছর ঝুলে থাকা মামলা। অপরাধীরা মুক্ত ঘুরে বেড়ায়, কারণ তারা জানে—এই ব্যবস্থা তাদের রক্ষা করবে।
যখন ধর্ষণ শাস্তিহীন হয়ে ওঠে, তখন তা আর শুধু অপরাধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি বার্তা।
বার্তা হলো—রাষ্ট্র নারীদের রক্ষা করবে না, ক্ষমতা আইনের চেয়ে বড়, আর নীরবতাই নিরাপদ।
এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা নয়।
এটি রাষ্ট্রের ইচ্ছাকৃত সুরক্ষা প্রত্যাহার।
শিশুদের নিরাপত্তা নেই, রাষ্ট্রের নৈতিকতা নেই
শিশুরা—সমাজের সবচেয়ে অসহায় অংশ—এ সহিংসতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার খবর নিয়মিত শিরোনাম হচ্ছে, তারপর নেমে আসছে পরিচিত নীরবতা। না আছে শীর্ষ পর্যায়ের ক্ষোভ, না আছে জরুরি বিচার, না আছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
যে রাষ্ট্র তার শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারিয়েছে।
যখন শিশুদের ওপর পাশবিকতা ঘটে এবং রাষ্ট্র নির্বিকার থাকে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়—এই সরকার মানবিকতার ন্যূনতম ভানটুকুও করছে না।
উল্লেখযোগ্যভাবে, মাত্র সাত মাসে শিশু ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে।
সংখ্যালঘুরা ‘ব্যবহারযোগ্য লক্ষ্যবস্তু’
সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলাও কাকতালীয় নয়। হিন্দুদের ঘরবাড়ি পোড়ানো হয়, মন্দির ভাঙচুর হয়, জমি দখল করা হয়, পরিবার উচ্ছেদ হয়। খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায় ভয়ভীতির মধ্যে থাকে। আদিবাসীরা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
প্রতিটি ঘটনাকে ‘স্থানীয় সমস্যা’, ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে ধামাচাপা দেওয়া হয়—কখনো সরাসরি অস্বীকার করা হয়। বাস্তবতা হলো, সংখ্যালঘুরা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য বলি। তাদের ভয় সমাজকে বিভক্ত করে, শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা থেকে দৃষ্টি সরায় এবং চরমপন্থীদের বার্তা দেয়—সহিংসতা সহনীয়।
রাষ্ট্রের নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়;
এটি সহযোগিতা।
আগুন এখন ক্ষমতার ভাষা
অগ্নিসংযোগ এখন সন্ত্রাসের কার্যকর হাতিয়ার। রাতারাতি পুড়ে যায় ঘরবাড়ি, মিনিটে ধ্বংস হয় ব্যবসা। কারখানা, দোকান, এমনকি গণমাধ্যম কার্যালয় জ্বালিয়ে দেওয়া হয় স্বাধীনতা ও ভিন্নমতকে শাস্তি দিতে।
এটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়—এটি কৌশল।
জীবিকা পুড়িয়ে দিলে প্রতিরোধ দুর্বল হয়।
গণমাধ্যমকে ভয় দেখালে সত্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
আগুন এখানে শুধু আগুন নয়—
এটি ক্ষমতার ভাষা, আর ভয় তার অনুবাদক।
রাষ্ট্র অক্ষম নয়—নির্বাচিতভাবে সক্রিয়
সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক দিকটি হলো রাষ্ট্রের নির্বাচিত দক্ষতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুর্বল নয়। বিরোধী দমন, বক্তব্য নজরদারি, প্রতিবাদ ভাঙা, সমালোচক গ্রেপ্তারে তারা অত্যন্ত দক্ষ।
কিন্তু ধর্ষণ, খুন, সংখ্যালঘু নির্যাতন বা অগ্নিসংযোগে সেই দক্ষতা উধাও হয়ে যায়।
এখানেই সত্য উন্মোচিত হয়—
আইন অনুপস্থিত নয়, আইন অস্ত্রায়িত।
সুরক্ষা আছে ক্ষমতাবানদের জন্য, শাস্তি আছে ভিন্নমতের জন্য।
সংখ্যায় ধরা পড়া রাজনৈতিক সহিংসতা
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জানুয়ারি–ডিসেম্বর সময়ে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। একই বছরে পুলিশের খাতায় ৩,৭৮৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
এগুলো কেবল সংখ্যা নয়।
এগুলো এমন একটি রাষ্ট্রের ছবি, যেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা ফুলে-ফেঁপে ওঠে, আর সাধারণ মানুষ মরতে থাকে—বিনা বিচারে, বিনা জবাবদিহিতে।
বিশৃঙ্খলা এখানে শাসনের ভিত্তি
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা নীরব। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো বিবৃতি দেয়, বা দেয়ই না। জবাবদিহির কাঠামো কাগজে আছে, বাস্তবে নয়। এই ব্যবস্থা নাগরিককে রক্ষা করে না—এটি ব্যবস্থা নিজেকেই রক্ষা করে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক মিথ্যা হলো—এই সরকার নাকি ‘অসহায়’।
যে সরকার বয়ান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, বিরোধী দমন করতে পারে, ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পারে—সে সরকার অসহায় নয়।
বিশৃঙ্খলা টিকে আছে কারণ এটি উপযোগী।
ভয় মানুষকে বিভক্ত করে।
সহিংসতা গণতান্ত্রিক প্রশ্নকে চাপা দেয়।
আইনহীনতা কর্তৃত্ববাদকে ন্যায্যতা দেয়।
এখানেই পরিকল্পনার মুখোশ খুলে যায়।
অস্থিতিশীলতা ক্ষমতার বাধা নয়—এটি তার ভিত্তি।
ইতিহাস এই সময়কে কী নামে ডাকবে
বাংলাদেশ আজ আইনশৃঙ্খলার অভাবে ভুগছে না।
বাংলাদেশ ভুগছে নাগরিককে রক্ষা করার ইচ্ছার অভাবে।
এই ব্যবস্থা সংস্কার করতে আসেনি—এটি নিয়ন্ত্রণ করতে এসেছে।
আর এই নিয়ন্ত্রণ টিকে থাকে ভয়, রক্ত আর নীরবতার ওপর।
যখন সহিংসতা দৈনন্দিন হয়ে যায়, বিচার নির্বাচিত হয়, আর জবাবদিহি ঐচ্ছিক হয়ে ওঠে—তখন বিশৃঙ্খলা আর দুর্ঘটনা থাকে না।
তা হয়ে ওঠে শাসনব্যবস্থা।
ইতিহাস এই সময়কে কোনো ‘দুর্ভাগ্যজনক অন্তর্বর্তীকাল’ হিসেবে মনে রাখবে না।
ইতিহাস একে মনে রাখবে জনগণের সঙ্গে একটি সচেতন বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে।