Bangladesh Awami League সরকারের সময় বাংলাদেশ অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে ৬–৭% জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। রপ্তানি—বিশেষত তৈরি পোশাক খাত—বিস্তার লাভ করে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বিনিয়োগ আস্থা বাড়ায়, দারিদ্র্য হ্রাস পায় এবং গ্রামীণ ভোগব্যয় বৃদ্ধি পায়। যদিও সরকারি ঋণ বেড়েছিল, দ্রুত প্রবৃদ্ধি সেই ঋণকে ধারণ করার সক্ষমতা তৈরি করেছিল এবং কর-সংগ্রহের নিম্নহার বা ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো আড়ালে ছিল।
বর্তমানে চিত্র ভিন্ন। প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, আর্থিক চাপ বেড়েছে, এবং সরকারি ঋণের বড় অংশ উন্নয়ন সম্প্রসারণের বদলে বিদ্যমান ব্যয় মেটাতে ব্যবহার হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক মনোভাব—এসব মিলিয়ে অর্থনীতির গতি হারানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মূল পার্থক্য অর্থনৈতিক পতন নয়—বরং গতি হারানো। আগে প্রবৃদ্ধি ঋণকে টিকিয়ে রাখত; এখন ঋণ বাড়ছে অর্থনীতির চেয়ে দ্রুত। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি প্রবৃদ্ধিনির্ভর স্থিতিশীলতা থেকে কাঠামোগতভাবে টেকসই আর্থিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারবে?
১️⃣ প্রবৃদ্ধি বনাম আর্থিক চাপ
আওয়ামী লীগ আমলে অর্থনীতি ছিল সম্প্রসারণমুখী ও তুলনামূলক স্থিতিশীল:
-
বার্ষিক গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬–৭%
-
তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি ধারাবাহিক বৃদ্ধি
-
বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ আস্থা বৃদ্ধি
-
দারিদ্র্য হ্রাস ও গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি
সরকার ঋণের ওপর নির্ভর করলেও উচ্চ প্রবৃদ্ধি তা ধারণ করত। ফলে রাজস্ব কাঠামোর দুর্বলতা বা শাসন-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা ততটা দৃশ্যমান ছিল না।
বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন:
-
প্রবৃদ্ধি মন্থর
-
রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি
-
উন্নয়ন সম্প্রসারণের বদলে চলতি ব্যয় মেটাতে ঋণ
২️⃣ উন্নয়নের জন্য ঋণ বনাম টিকে থাকার জন্য ঋণ
আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি ঋণের বড় অংশ দৃশ্যমান প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল:
-
সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ে
-
বিদ্যুৎকেন্দ্র
-
মেট্রোরেল
-
বন্দর ও লজিস্টিক উন্নয়ন
এই ব্যয় ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা বাড়াবে—এমন যুক্তি তুলে ধরা হতো।
এখন ঋণ বাড়ছে প্রধানত:
-
ভর্তুকি
-
সরকারি বেতন
-
জ্বালানি আমদানি
-
পূর্বের ঋণ পরিশোধ
উন্নয়নের জন্য ঋণ ভবিষ্যৎ আয় সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু নিয়মিত ব্যয়ের জন্য ঋণ আর্থিক চাপের ইঙ্গিত দেয়।
৩️⃣ আন্তর্জাতিক আস্থা: সাফল্যের গল্প থেকে সতর্কতা
গত দশকে:
-
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিক বৃদ্ধি
-
প্রবাসী আয় স্থিতিশীল
-
ক্রেডিট রেটিং উন্নতি
-
বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীল অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা
World Bank ও International Monetary Fund বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সহনশীল অর্থনীতি হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
বর্তমানে:
-
রিজার্ভে চাপ
-
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বৃদ্ধি
-
বাজেট ঘাটতি বিস্তৃত
-
বিনিয়োগকারীদের আস্থা তুলনামূলক সতর্ক
এটি ধস নয়, বরং প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া।
৪️⃣ রাজনৈতিক অর্থনীতি: ধারাবাহিকতা বনাম রূপান্তর
আওয়ামী লীগ আমলের বৈশিষ্ট্য ছিল:
-
নীতিগত ধারাবাহিকতা
-
কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত
-
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
-
পূর্বানুমানযোগ্য অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা
বর্তমান Bangladesh Nationalist Party প্রশাসন মোকাবিলা করছে:
-
রাজনৈতিক রূপান্তরের ব্যয়
-
উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ঋণ
-
কল্যাণমূলক ব্যয়ের প্রত্যাশা
-
ধীর রাজস্ব বৃদ্ধি
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় অর্থনৈতিক চাপ বাড়া অস্বাভাবিক নয়।
৫️⃣ অপরিবর্তিত কাঠামোগত দুর্বলতা
দুই সময়েই কিছু সমস্যা ছিল অপরিবর্তিত:
-
জিডিপির তুলনায় অত্যন্ত কম কর-সংগ্রহ
-
তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা
-
জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি
-
ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা
-
ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ
আগে উচ্চ প্রবৃদ্ধি এসব সমস্যাকে আড়াল করেছিল; এখন মন্থর প্রবৃদ্ধি সেগুলো স্পষ্ট করে তুলছে।
সারসংক্ষেপ
এটি “ভাল বনাম খারাপ অর্থনীতি”র সরল তুলনা নয়।
মূল পার্থক্য হলো:
👉 আওয়ামী লীগ আমলে প্রবৃদ্ধি ঋণকে ধারণ করেছিল।
👉 এখন ঋণের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনই ব্যবস্থাপনাযোগ্য ঋণকে সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকিতে রূপান্তরিত করে।
প্রকৃত প্রশ্ন—কোন সরকার ভালো করেছে তা নয়; বরং বাংলাদেশ কি প্রবৃদ্ধিনির্ভর স্থিতিশীলতা থেকে কাঠামোগতভাবে টেকসই রাজস্ব ও আর্থিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারবে?