Menu
Back to timeline

বাংলাদেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে: ঋণের বোঝা বাড়ছে, বিনিয়োগ থমকে, উন্নয়ন হারাচ্ছে গতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে: ঋণের বোঝা বাড়ছে, বিনিয়োগ থমকে, উন্নয়ন হারাচ্ছে গতি

একসময়ের এশিয়ার ‘উদীয়মান অর্থনৈতিক বাঘ’—বাংলাদেশ আজ বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। দ্রুত বাড়তে থাকা জাতীয় ঋণ, বিনিয়োগের পতন এবং স্থবির উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনীতিকে এক অনিরাপদ মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রবৃদ্ধির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে—অদক্ষ প্রশাসন, দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনা ও সর্বব্যাপী দুর্নীতির কারণে অর্থনীতির ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।


অভূতপূর্ব ঋণ বৃদ্ধি: অর্থনীতি এক বিপজ্জনক বাঁকে

অর্থনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হলো দ্রুত বাড়তে থাকা আর্থিক ঘাটতি। কমে যাওয়া রাজস্ব সংগ্রহ এবং অদক্ষ ব্যয়ের ফলে সরকার বাধ্য হয়েছে ধার ও ঋণ গ্রহণে নির্ভরশীল হতে।

মাত্র এক বছরে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন টাকা, যা বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১.৪৪ ট্রিলিয়ন টাকা—যার মধ্যে ৯.৫ ট্রিলিয়ন বৈদেশিক এবং ১২ ট্রিলিয়ন অভ্যন্তরীণ ঋণ।

২০০৯ সালে যেখানে জাতীয় ঋণ ছিল ২.৭৬ লাখ কোটি টাকা, সেখানে এক দশক–দেড়েকের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ ট্রিলিয়নেরও বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অব্যবস্থাপনা, অপচয়, এবং “অদূরদর্শী আর্থিক সিদ্ধান্ত”—এই তিনের মিশ্রণই বাংলাদেশকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ঋণজালে আটকে ফেলেছে। শুধু সুদ পরিশোধেই গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ১.৩২ ট্রিলিয়ন টাকা, যা বাজেটকে কার্যত “সুদনির্ভর” করে ফেলেছে।


বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থান সংকুচিত—অর্থনীতির ইঞ্জিন থেমে যাচ্ছে

ঋণের বোঝা বাড়তে থাকলেও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার প্রধান শক্তি—বিনিয়োগ—সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংক খাতে ঘাটতি, ডলার সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতা নতুন বিনিয়োগকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।

  • কারখানাগুলো কাঁচামাল আমদানিতে বাধাগ্রস্ত

  • ব্যাংক ঋণ ও ক্রেডিট সাপোর্ট কমে গেছে

  • উৎপাদন কমছে, ছাঁটাই বাড়ছে

উদ্যোক্তাদের ভাষায়: “নীতির অনিশ্চয়তার চেয়ে দুর্নীতিই আজ বড় বাধা।”
পর্যবেক্ষকদের মতে, ‘ডিউটি–ব্রাইব–অ্যাপ্রুভাল’ চক্র ব্যবসা ও শিল্প খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


উন্নয়ন প্রকল্পে অচলাবস্থা: রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় নিদর্শন

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন নেমে এসেছে ৬৮ শতাংশের নিচে—গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকার পরিবর্তন, প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন ও নীতিগত বিশৃঙ্খলা এতে ভূমিকা রেখেছে।

প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে আছে তিনটি প্রধান কারণে:

  • চরম প্রশাসনিক ধীরগতি

  • প্রকল্পভিত্তিক ‘কমিশন সংস্কৃতি’ ও দুর্নীতি

  • অদক্ষ নেতৃত্ব ও জটিল তহবিল ব্যবস্থাপনা

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, উন্নয়ন যদি থেমে যায়, তখন ঋণ আর বিনিয়োগ থাকে না—বরং পরিণত হয় ভবিষ্যতের বোঝায়।


রাজস্ব–জিডিপি ফাঁদ: চিরস্থায়ী সংকটের মূল কারণ

বাংলাদেশের কর–জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭–৭.৫ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম। রাজস্ব ঘাটতির কারণগুলো হলো:

  • দুর্বল ও অস্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো

  • রাজনৈতিক প্রভাবিত কর ছাড়

  • এনবিআরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই রাজস্ব ঘাটতি ১৭ হাজার কোটি টাকা ছুঁয়েছে। নিম্ন রাজস্ব—উচ্চ ঋণ—উন্নয়ন সংকোচন—এই চক্র বহু বছর ধরে একইভাবে চলছে।


মেগা প্রকল্প: মেগা ঝুঁকি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বহু মেগা প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়, দুর্নীতি ও বিলম্বের কারণে বৈদেশিক ঋণ ভয়াবহ হারে বেড়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাহ্যিক ঋণ বৃদ্ধির হার সবচেয়ে দ্রুত।

২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে এসব প্রকল্পের বড় কিস্তি পরিশোধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হবে।

আইএমএফ ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে "মধ্যম মাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ" ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।


অর্থনীতি এক অনিরাপদ সড়কে

কাগজে-কলমে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। রাজস্ব দুর্বল, বিনিয়োগ নেই, উৎপাদন কমছে, উন্নয়ন স্থবির—সব মিলিয়ে দুর্নীতি ও অদক্ষতা অর্থনীতির ভিত খেয়ে ফেলছে। ঋণ বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়ছে না।

বাংলাদেশ এখন এমন এক আর্থিক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পতন।

More from the timeline

View all