বিশ শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে বিশ্বজুড়ে ছিল ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা। নানা মহাদেশে স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠছিল। কোথাও কমিউনিস্ট বিপ্লব রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দিচ্ছিল, আবার কোথাও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত দেখা দিচ্ছিল।
কিন্তু বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম সেই সময়কার বহু সংঘাত থেকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ অনেকাংশেই সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছিল। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্বকারী দল Awami League জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই বিজয় কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য ছিল না; এটি ছিল বাঙালি জনগণের স্পষ্ট গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট এবং জাতীয় ঐক্যের শক্তিশালী প্রকাশ।
এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন Sheikh Mujibur Rahman—যিনি পরবর্তীতে “বঙ্গবন্ধু”, অর্থাৎ “বাংলার বন্ধু” নামে সমগ্র জাতির কাছে শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠেন।
দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি প্রথমে বাঙালির মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ভাষার অধিকার আদায়ের সেই সংগ্রাম ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়, যার লক্ষ্য ছিল পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতিকে রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার পর তিনি ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক Six-Point Movement। এই ছয় দফা কর্মসূচি বাঙালি জনগণের কাছে “বাঁচার সনদ” হিসেবে পরিচিতি পায় এবং কার্যত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কাঠামো নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন করে।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনৈতিক আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের নানা ষড়যন্ত্র, মিথ্যা মামলা, কারাবরণ এবং দমন-পীড়নের মধ্যেও বঙ্গবন্ধুর দল নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে।
১৯৭১ সালের শুরুতেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়। প্রায় সাত কোটি বাঙালি এক অভিন্ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। মার্চের শুরুতেই কার্যত দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার নিয়ন্ত্রণ বঙ্গবন্ধুর হাতে চলে আসে। তিনি প্রতিদিনের নির্দেশনা ও কর্মসূচির মাধ্যমে জাতিকে পরিচালিত করতে থাকেন এবং প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য জনগণকে প্রস্তুত করেন।
এরপর আসে ইতিহাসের সেই ভয়াবহ মোড়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী “Operation Searchlight” নামে এক নৃশংস সামরিক অভিযান শুরু করে। ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র মানুষের ওপর পরিচালিত এই হামলা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক অন্ধকারতম অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
এই গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আসে, এবং শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
সেই মুহূর্ত থেকে বাঙালি জাতি শোষণ ও দমন-পীড়নের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রাম, অগণিত ত্যাগ ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় একটি নতুন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।
অতএব, মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল একটি যুদ্ধ নয়; এটি ছিল কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। এই সংগ্রাম বাঙালি জাতিকে বিশ্ব দরবারে একটি সাহসী, দৃঢ়চেতা ও আত্মত্যাগী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে—যে জাতি স্বাধীনতা অর্জন করেছে ত্যাগ, ঐক্য এবং অদম্য প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে।