বাংলাদেশ আজ এক ভয়ঙ্কর সঙ্কটে দাঁড়িয়ে। যে দেশ ১৯৭১ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদের আদর্শে জন্ম নিয়েছিল, সেটি আজ টেনে নেওয়া হচ্ছে ধর্মীয় মৌলবাদের অন্ধকারে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর যে স্থিতিশীলতা আশা করা হয়েছিল, তার বদলে দেশে উন্মুক্ত হয়েছে জঙ্গিবাদের দুয়ার। আর এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তথাকথিত “নিরপেক্ষ” অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান, নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুস—যিনি আসলে নিরপেক্ষতার মুখোশে উগ্রপন্থীদের সাথে এক সুপরিকল্পিত যোগসূত্র গড়ে তুলেছেন।
উগ্রবাদের পুনরুত্থান
ইউনুসের আমলে নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরীর আবারও মাথাচাড়া দিয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে, আর উগ্রবাদী নেতাদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে। মাজার ভাঙচুর, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা, নারীর অধিকার খর্বকরণ—সবই চলছে রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ে। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি সুস্পষ্টভাবে মৌলবাদকে ক্ষমতায় আনার কৌশল।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নোবেলজয়ী উন্নয়নকর্মী হিসেবে প্রশংসিত হলেও, দেশের ভেতরে ইউনুসের চেহারা একেবারেই ভিন্ন—সুযোগসন্ধানী, বিশ্বাসঘাতক ও মৌলবাদপুষ্ট এক শাসকের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে তিনি ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছেন, আর এর ফলে বাংলাদেশ আজ শুধু রাজনৈতিক সঙ্কটে নয়, অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
ক্ষমতার শূন্যতা থেকে উগ্রপন্থার উত্থান
শেখ হাসিনার নির্বাচিত সরকার পতনের পর বাংলাদেশে একটি নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতা পূরণ করতে সামনে আসেন ইউনুস, নিজেকে তুলে ধরেন “নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক” হিসেবে। কিন্তু তাঁর নিরপেক্ষতা ছিল শুধুই মুখোশ। নির্বাচনী ম্যান্ডেটহীন এই সরকারপ্রধান ক্ষমতা সুসংহত করতে দ্রুতই হাত বাড়ান উগ্রবাদী গোষ্ঠীর দিকে—যাদের এতদিন রাষ্ট্র কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
রাষ্ট্রযন্ত্রে জঙ্গিদের বসতি
অল্প সময়েই রাষ্ট্র ও জঙ্গিবাদের সীমারেখা মুছে যায়। হিজবুত তাহরীরের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নাসিমুল ঘানিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব করা হয়। একইভাবে দুইবার গ্রেপ্তার হওয়া সত্ত্বেও হিজবুত তাহরীরের সাথে জড়িত মোহাম্মদ ইজাজকে ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বানানো হয়। শুধু তাই নয়, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা ও ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যার প্ররোচক জঙ্গি জসিম উদ্দিন রহমানীকেও কারামুক্ত করা হয়।
এই ধরনের পদক্ষেপ কেবল দুর্বলতা নয়; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রে জঙ্গিদের প্রবেশের জন্য সচেতন দরজা খোলা।
সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের উপর আক্রমণ
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর। মন্দির ভাঙচুর, গির্জায় হামলা, সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখল, অগ্নিসংযোগ—এসব ঘটনায় তাদের জীবন আবারও অনিশ্চয়তায় ভরে উঠেছে। খ্রিষ্টান সম্প্রদায় গির্জা ছেড়ে গোপনে প্রার্থনা করতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ এসব ঘটনায় সরকারের নীরবতা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের রক্ষায় আর নেই।
রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের ভয়াবহ মূল্য
মূল সত্য হলো—বাংলাদেশে মৌলবাদের এই উত্থান কোনো দৈব ঘটনা নয়; এটি ইউনুস সরকারের রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের ফল। নিজের বৈধতা ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি জামায়াত, শিবির ও হেফাজতের মতো গোষ্ঠীগুলোর উপর নির্ভর করেছেন। এর বিনিময়ে তারা আবারও রাষ্ট্র ও সমাজে প্রভাব বিস্তার করছে।
কিন্তু এই স্বল্পমেয়াদি কৌশল দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে। ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি ভেঙে যাচ্ছে, সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, আর উগ্রপন্থীরা রাষ্ট্রের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
উপসংহার
শেখ হাসিনার সরকার যদিও নানা সমালোচনার মুখে ছিল, তবু তিনি মৌলবাদী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। কিন্তু ইউনুসের হাতে বাংলাদেশ আজ ১৯৭১-এর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে উল্টো পথে হাঁটছে। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এই ব্যক্তির হাত ধরে দেশ আবারও মৌলবাদের অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে—এটি শুধু রাজনৈতিক বিপর্যয় নয়, জাতীয় অস্তিত্বের জন্য এক দুঃস্বপ্ন।