বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বিচার গ্রেপ্তার যেন রাষ্ট্রীয় দমননীতির প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। দলীয় কর্মী থেকে সাবেক মন্ত্রী, সম্মানিত বুদ্ধিজীবী থেকে সাধারণ নাগরিক—কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। অপরাধ প্রমাণের ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ কিংবা শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশ নেওয়ার “অপরাধে” মানুষদের আটক করা হচ্ছে।
সরকারের ভণ্ডামি ও গণতন্ত্রের সংকট
এই গ্রেপ্তারগুলো কাকতালীয় নয়, বরং সুপরিকল্পিত। উদ্দেশ্য স্পষ্ট—রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে ধ্বংস করে দেশের অর্ধেক মানুষের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়া। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় শক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরোধী দল ও মতকে নিশ্চিহ্ন করতে। ফলে দেশ আরও গভীর মেরুকরণ, ভীতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্ষয়ের দিকে এগোচ্ছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই দমনচক্র থেকে মুক্ত হতে পারবে?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতির রাজনৈতিক চেতনা দীর্ঘদিন দমন করে রাখা যায় না। একমাত্র অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন—যেখানে আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক শক্তি অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে—সেই পথই জাতিকে নতুন করে আশা দেখাতে পারে।
নিরাপদ জায়গা আর নেই: শিক্ষার্থী, নারীনেত্রী ও বুদ্ধিজীবীরা টার্গেটে
দেশব্যাপী গ্রেপ্তারের ধরন সুস্পষ্টভাবে পরিকল্পিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ ইবনে সাদিক, আমির হামজা প্রমুখ ছাত্রনেতাদের গ্রেপ্তার দেখিয়েছে যে রাষ্ট্র ছাত্ররাজনীতির মেরুদণ্ডকে ভেঙে দিতে চায়। তাদের বিরুদ্ধে কোনো সহিংসতার অভিযোগ ছিল না; একমাত্র অপরাধ—আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা।
টেকনিক্যাল এলাকায় হঠাৎ স্লোগান দেওয়া একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নেওয়া ৯ জন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এটিকে “ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ” হিসেবে সাজিয়ে মামলা দিয়ে দেওয়া হয়। আবার সাবেক সাংসদ সাদ্দাম হোসেন পাভেলের গ্রেপ্তার সরকারের সেই কৌশলই স্পষ্ট করে—দৃশ্যমান নেতৃত্বকে সরিয়ে ফেলা, ক্ষুদ্রতম কর্মীকেও মামলা দিয়ে ফাঁসানো, এবং পুরো রাজনৈতিক কাঠামোকে অচল করা।
নারী নেত্রীদের ক্ষেত্রেও একই কৌশল। মাহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী নাহিদা নূর সুইটির ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বোরকা পরে স্বামীসহ নীরবে মিছিলে যোগ দিয়েও তিনি ধরা পড়লেন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাদের নজরে। অভিযোগ—তিনি নাকি মিছিল অর্থায়ন করেছেন! এ অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য না হলেও এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট—নারী নেতৃত্বকেও ভয় দেখানো, যাতে কোনো প্রতীকী আন্দোলনও আর টিকে না থাকে।
বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারকেরাও বাদ নেই
শুধু কর্মী বা নেত্রী নন, বরং সম্মানিত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সাবেক আমলারা পর্যন্ত গ্রেপ্তারের শিকার হচ্ছেন। সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কারজনের গ্রেপ্তার প্রমাণ করে, এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনাও এখন অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
অত্যন্ত উদ্বেগজনক হলো, শেখ হাসিনার সাবেক প্রেস সচিব ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব আবু আলম শহীদ খানের গ্রেপ্তার। কেবল একটি রাউন্ডটেবিল আলোচনায় অংশ নেওয়ার কারণে তাঁকে আটক করা হয়। যদি এমন একজন আমলা-বুদ্ধিজীবী নিরাপদ না থাকেন, তবে সাধারণ নাগরিকদের জন্য আর কোনো নিরাপদ ক্ষেত্র অবশিষ্ট থাকে না।
সহিংস ঘটনাকে ব্যবহার করে নির্বিচার দমন
চট্টগ্রামের সল্টগোলা ক্রসিংয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাকে ব্যবহার করে ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট দোষীদের বিচারের পরিবর্তে নির্বিচারে নাম-ঠিকানা অজ্ঞাত ডজনখানেক কর্মীর ওপর মামলা দিয়ে গোটা রাজনৈতিক নেটওয়ার্ককে ধ্বংসের চেষ্টা চলছে।
পরিকল্পিত দমননীতি, কাকতালীয় নয়
এই গ্রেপ্তারের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি কৌশলগত দমননীতি। ছাত্রনেতাদের আগে টার্গেট করা হচ্ছে কারণ ইতিহাসে তারা সবসময় পরিবর্তনের অগ্রদূত। নারী নেত্রীদের অপরাধী বানানো হচ্ছে যাতে কোনো প্রতীকী প্রতিবাদও না টিকে। বুদ্ধিজীবীদের চুপ করিয়ে দিয়ে মুক্ত আলোচনা ও নীতি-আলোচনা বন্ধ করা হচ্ছে। আর সহিংস ঘটনার অজুহাতে নির্বিচারে গ্রেপ্তার করে বিরোধী নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
নীরবতার ভয়াবহ মূল্য
এই নির্বিচার গ্রেপ্তারের প্রভাব সীমিত নয়। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই আঘাত করছে। মানুষ ভয়ে মতামত প্রকাশ করছে না, আলোচনা সভায় যাচ্ছে না, এমনকি শান্তিপূর্ণ মিছিলেও অংশ নিতে সাহস পাচ্ছে না। এভাবে একটি প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজকে পরিণত করা হচ্ছে আতঙ্কিত নীরবতার ভূখণ্ডে।
এই পরিস্থিতি দেশে আরও তীব্র মেরুকরণ তৈরি করছে। বিরোধী কণ্ঠগুলোকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে বাদ দেওয়ার ফলে তারা অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কে আশ্রয় নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব ভয়াবহ। নির্বিচার গ্রেপ্তার, বিশেষত ছাত্রনেতা, নারী নেত্রী ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর দমননীতি, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিদেশি বিনিয়োগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক মঞ্চে দেশের অবস্থান বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
মুক্তির একমাত্র পথ: অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন
এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। যেখানে আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। কেবল তখনই মানুষ আশ্বস্ত হবে যে তাদের মত প্রকাশ, প্রতিবাদ বা অংশগ্রহণ আর অপরাধ নয়।
একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেশের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরিয়ে আনবে, মেরুকরণ কমাবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে। দমননীতি দিয়ে রাজনৈতিক বৈধতা টেকসই হয় না। কেবল জনগণের অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই এই দমনচক্র ভেঙে জাতিকে নতুন পথ দেখাতে পারে।