Menu
Back to timeline

নির্বাচন এলে দেশপ্রেমী সাজে, ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতিতে দেশকে চ্যাম্পিয়ন বানায়

নির্বাচন এলে দেশপ্রেমী সাজে, ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতিতে দেশকে চ্যাম্পিয়ন বানায়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বেদনাদায়ক প্রবণতা হলো—নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদেরকে জনগণের প্রকৃত বন্ধু, দেশপ্রেমিক ও সেবক হিসেবে উপস্থাপন করে, অথচ ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই সেই মুখোশ খুলে যায়। তারা দুর্নীতি, লুটপাট, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে এতটাই নিমজ্জিত হয় যে দেশের ভাবমূর্তি বারবার কলঙ্কিত হয়। আজ বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত কিংবা অন্যান্য নামধারী রাজনৈতিক শক্তি—প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা কমবেশি বিদ্যমান।

নির্বাচনের আগে তারা বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেয়—দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়া, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে আমূল সংস্কার, এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার আশ্বাস। কিন্তু জনগণ ভোট দিয়ে তাদেরকে ক্ষমতায় বসানোর পর দেখা যায় বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে তারা নিজেদের দলীয় লোকজনকে ধনী বানাতে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করতে এবং প্রশাসনকে দলীয়করণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির যন্ত্রে রূপান্তর করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

বিএনপি তাদের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে দুর্নীতির চক্র তৈরি করেছিল। দুই শীর্ষ নেত্রীর পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং কেলেঙ্কারির দায়ে দেশ আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। জাতীয় পার্টি একসময় ক্ষমতায় গিয়ে সামরিক শাসনের ছায়া বৈধ করার চেষ্টা করেছে, অথচ গণতন্ত্রের নামে তারা কেবল ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার খেলায় লিপ্ত ছিল। জামায়াত তো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি হিসেবে ইতিহাসে কলঙ্কিত; অথচ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে তারা ক্ষমতার স্বাদ নিতে চেয়েছে এবং ক্ষমতায় গিয়ে ইসলামি মূল্যবোধের নামে দুর্নীতিরই চর্চা করেছে।

এই রাজনৈতিক দলগুলোর এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ব্যবহার করে তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে তাদের বক্তৃতায় দেশপ্রেম উথলে পড়ে; তারা শহীদদের রক্ত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার ইত্যাদি নিয়ে আবেগঘন ভাষণ দেয়। কিন্তু ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর সেই দেশপ্রেম কোথায় উধাও হয়ে যায়, তা জনগণ জানে না। তখন দেশপ্রেম আর মানুষের কল্যাণ নয়, বরং দলীয় স্বার্থ, অর্থলোভ আর ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

ফলাফল হিসেবে জনগণ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো—সবখানেই সুশাসনের ঘাটতি দেখা যায়। বিদেশে বাংলাদেশ প্রায়ই দুর্নীতির সূচকে উচ্চ অবস্থানে থেকে লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এই দুর্নীতি কোনো অজানা শক্তি সৃষ্টি করে না, বরং দেশের তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলোই এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

রাজনীতির এই ভণ্ডামি জনগণের আস্থাকে ধ্বংস করেছে। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিকে এখন অবিশ্বাসের চোখে দেখে, কারণ তাদের কাছে স্পষ্ট যে—যে দলই ক্ষমতায় আসুক, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর প্রতিশ্রুতিভঙ্গই হলো একমাত্র ধ্রুব সত্য।

অতএব, বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রমাণ করছে যে তাদের দেশপ্রেম কেবল নির্বাচনী প্রচারণার অলঙ্কারমাত্র। ক্ষমতায় গেলে তারা দেশকে উন্নত করার বদলে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানানোর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। জনগণ যদি সজাগ না হয় এবং নতুন প্রজন্ম সৎ, নৈতিক নেতৃত্বের দাবি না তোলে, তবে এই দুষ্টচক্র চলতেই থাকবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।

More from the timeline

View all