বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মধ্যে সাম্প্রতিক একটি বড় নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। রাজধানী থেকে দূরবর্তী এক জেলা শহরে নদীর উপর নির্মিত হতে থাকা একটি সেতুর কাজ পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, কাজের মান নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে, অথচ কাগজপত্রে উচ্চমানের সামগ্রী ব্যবহারের হিসাব দেখানো হয়েছে।
প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরকারি নথিতে ৬০ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করলেও মাঠ পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায়, কাজের অর্ধেকও শেষ হয়নি। নির্মাণে ব্যবহৃত রডের মান নিম্নমানের, সিমেন্টের গুণগত মান পরীক্ষায় অকৃতকার্য, এবং বালু-খোয়ার মিশ্রণে নির্ধারিত অনুপাত মানা হয়নি। প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরণের নিম্নমানের কাজ শুধু অর্থের অপচয়ই নয়, ভবিষ্যতে সেতুটি ব্যবহারে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের বাজেট অনুমোদনের পর থেকেই কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গোপন চুক্তি হয়। এ চুক্তির মাধ্যমে কাগজপত্রে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ধাপে ধাপে অর্থ উত্তোলন করা হয়। এমনকি প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তারা অভিযোগ করেছেন, উন্নয়নের নামে বড় অঙ্কের অর্থ লুটপাট হচ্ছে, অথচ জনগণ সেই সুবিধা পাচ্ছে না। গ্রামাঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর ধরে নির্ভরযোগ্য সেতুর জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু দুর্নীতির কারণে সেই স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশেই অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে। এই ঘটনায় সেই পরিসংখ্যানের সত্যতা নতুন করে প্রমাণিত হলো।
সরকারি মহল থেকে জানানো হয়েছে, দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে এবং প্রকল্পের সব নথি সংগ্রহ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের দুর্নীতি রোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ জনসমক্ষে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা জরুরি। অন্যথায় উন্নয়নের বাজেট বাড়লেও তার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না, বরং দুর্নীতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে।
এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল, বাংলাদেশে উন্নয়নের গতি যতই বাড়ুক না কেন, যদি জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়, তবে সেই উন্নয়ন জনগণের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারবে না।