Menu
Back to timeline

তোফায়েল আহমেদের শেষযাত্রা: যখন শোকও হয়ে ওঠে অপরাধ

তোফায়েল আহমেদের শেষযাত্রা: যখন শোকও হয়ে ওঠে অপরাধ

বাংলাদেশ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান এবং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনার কথা বারবার বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রবীণ রাজনীতিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং নয়বারের সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদের শেষ বিদায় সেই দাবির বিপরীত এক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার প্রয়াণ নয়; বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং মানবিকতার বর্তমান অবস্থার একটি কঠিন প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

২০২৬ সালের ১ জুন তোফায়েল আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মতো একজন প্রবীণ জাতীয় নেতার বিদায়কে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় শোক, শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণের পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। ঢাকার ধানমন্ডিতে প্রথম জানাজা শেষে উপস্থিত সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীরা আবেগঘন পরিবেশে বিভিন্ন স্লোগান দিতে শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। কয়েকজনকে আটক করা হয়, আর লাঠিধারী পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপের দৃশ্য দ্রুত জনমনে প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এটি কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ ছিল না। এটি ছিল একজন প্রবীণ জাতীয় নেতার জানাজা। তবুও যেন শোক প্রকাশকেও সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হলো। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশে কি এখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে মৃত ব্যক্তিকেও রাজনৈতিক পরিচয় থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না?

ঘটনার প্রতিক্রিয়া শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তোফায়েল আহমেদের নিজ জেলা ভোলাতেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং জনসমাগম সীমিত করার প্রচেষ্টা নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়। সমালোচকদের মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল তাঁর শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে স্বতঃস্ফূর্ত জনসমাগম ও জনমতের প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করা।

এখানেই সামনে আসে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন: যে রাষ্ট্র মানুষের শোক প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যে প্রশাসন একটি জানাজাকেও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, সেই রাষ্ট্র কি সত্যিই নিজেকে উদার, গণতান্ত্রিক বা “নতুন বাংলাদেশ” হিসেবে পরিচয় দিতে পারে?

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে আরও গভীর এক বৈপরীত্য চোখে পড়ে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন খোকার জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে মৃত্যু ও শোকের মুহূর্ত দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও মানবিকতা ও সৌজন্য রক্ষা করা যায়। কিন্তু আজ তাঁর নিজের শেষযাত্রাকে ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপরীত এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র কখনো মানুষের কান্নাকে ভয় পায় না। একটি শক্তিশালী সরকার কবরস্থানের পাশে উচ্চারিত স্লোগানে আতঙ্কিত হয় না। কারণ প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় সহনশীলতায়, নিয়ন্ত্রণে নয়। যখন একটি সরকার মৃত ব্যক্তির স্মরণসভা বা জানাজাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন অনুভব করে, তখন সেটি শক্তির নয়, বরং অনিরাপত্তার লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও এই ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন বা রাজনৈতিক স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকার, মর্যাদা এবং স্বাধীনতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদি একজন প্রবীণ জাতীয় নেতার শেষ বিদায়ও বিতর্ক ও নিয়ন্ত্রণের ছায়া থেকে মুক্ত না থাকে, তাহলে ভিন্নমত পোষণকারী সাধারণ নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।

তোফায়েল আহমেদের শেষযাত্রা তাই শুধু একজন মানুষের বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি কঠিন পরীক্ষা। প্রশ্নটি এখন আরও বড়—বাংলাদেশ কি এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছে, যেখানে মর্যাদা, সহনশীলতা ও মানবিকতা স্থান পাবে, নাকি এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক বিভাজন মানুষের মৃত্যুর পরও তাকে অনুসরণ করবে?

ইতিহাস একদিন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে। কিন্তু আজকের বাস্তবতা আমাদের সামনে সেই প্রশ্নটিই আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছে।

More from the timeline

View all