Menu
Back to timeline

জেনেভায় আন্তর্জাতিক সেমিনারে বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট, আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা

জেনেভায় আন্তর্জাতিক সেমিনারে বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট, আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা

শেখ হাসিনাসহ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে এল গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা প্রেস ক্লাবে শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট, আইনের শাসন, মানবাধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার সাবেক রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নেন।

“বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট: শিক্ষার অধিকার, নির্বিচার আটক ও বিতর্কিত ট্রাইব্যুনালের রায়” শীর্ষক সেমিনারে মূল বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. মো. হাবিবে মিল্লাত, সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য পাওলো কাসাকা, জার্মানির দক্ষিণ এশিয়া গণতান্ত্রিক ফোরামের গবেষণা পরিচালক ড. জিগফ্রিড ও. উলফ, জাপানের মানবাধিকারকর্মী শিনিচি ফুজিকি, সিডস-আফ্রিকার সভাপতি কার্ল গুস্তাভ বিয়ার্টনেস, অধ্যাপক আলফ্রেড ডি জায়াস, ড. চনসি আয়াচ জোসেফ এবং সুইডিশ আইনজীবী মোনা হাগো স্ট্রিন্ডবার্গ।

গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্টস এবং তুমুকু ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কালচারাল ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিশেষজ্ঞদের মতামত বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শেখ হাসিনা: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে জনগণের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে

মূল বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ একটি গুরুতর সাংবিধানিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত জনগণের স্বাধীন, সচেতন ও নির্ভীক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এসব ঘটনার পর বাংলাদেশে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নির্বিচার আটক, রাজনৈতিক প্রভাবাধীন বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়; এটি নাগরিকদের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া, আইনের চোখে সমতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ভয়ভীতি, কারাবাস কিংবা প্রতিশোধের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাধানের অঙ্গীকার।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয় না। তাঁর মতে, পরিস্থিতিকে শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি আইন, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষার্থী পরিচয় বা সনদ হারানোর ঘটনা ঘটেছে এবং তরুণ পেশাজীবীদের চাকরিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় কখনোই সম্মিলিত অপরাধের দায় নির্ধারণের ভিত্তি হতে পারে না। অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রত্যেক ব্যক্তির দায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় পৃথকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

আটক ও বিচারব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থক আটক, মামলার মুখোমুখি অথবা আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর মতে, ফৌজদারি আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, সমান আচরণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, বিচারিক ও ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থাকলে রাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি কার্যকর করার ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টিও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

তিনি বলেন, দেশের কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তি ও তার সমর্থকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া হলে নির্বাচন প্রকৃত অর্থে প্রতিনিধিত্বশীল হতে পারে না। তাঁর ভাষায়, “বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণকেই নির্ধারণ করতে হবে।” এই সিদ্ধান্ত আসতে হবে জনগণের স্বাধীন ও সচেতন মতামতের ভিত্তিতে—ভয়, বলপ্রয়োগ কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে নয়।

জাতিসংঘ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ, মানবাধিকার সংস্থা, আইনজীবী সমাজ ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের দেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নির্বিচার আটক ও রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের সুরক্ষা, হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা এবং মতপ্রকাশ, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে—প্রতিশোধের ভিত্তিতে কোনো জাতি তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। তিনি এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে মানুষ মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে, আইন দুর্বল ও শক্তিশালী—সবার অধিকার রক্ষা করবে এবং রাষ্ট্রের মালিকানা থাকবে জনগণের হাতে।

হাবিবে মিল্লাত: আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার চাপে

গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্টসের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. হাবিবে মিল্লাত উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশের আইনের শাসন, বিচারিক সুরক্ষা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মীদের একত্র করার উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের মতামত শোনা এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

হাবিবে মিল্লাতের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দুই লাখের বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে রয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের ওপর অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা আরোপের অভিযোগও তুলে ধরেন।

তাঁর বক্তব্যে সাংবাদিক, পেশাজীবী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ, চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশাজীবীর হয়রানি এবং কারাগারে আটক ব্যক্তিদের আইনি ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার বিষয়গুলো উঠে আসে।

তিনি বলেন, মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য শর্ত। জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে অংশগ্রহণকারী মানবাধিকারকর্মীদের প্রতি বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

হাবিবে মিল্লাত বলেন, “আমরা কারও অনুগ্রহ চাই না। আমরা ন্যায়বিচার চাই। আমরা আমাদের অধিকার ফিরে পেতে চাই। আমরা বাংলাদেশকে আবার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই।”

পাওলো কাসাকা: বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সংকটের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে

সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য পাওলো কাসাকা বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সাংবিধানিক বিরোধ কিংবা সাধারণ রাজনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, বিষয়টি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সংকট ও গুরুতর মানবাধিকার-উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হওয়া, সাংবাদিকদের ওপর চাপ এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের কারাবন্দি করার অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও আদর্শিক চাপের সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি। ইতিহাসের বিভিন্ন উদাহরণ উল্লেখ করে কাসাকা বলেন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, আদর্শিক পুনর্গঠন এবং নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে আইনের ব্যবহার সমাজের ওপর বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাঁর মতে, বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিতর্ক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনকে কেন্দ্রে রাখতে হবে। সাংবিধানিক কাঠামো কিংবা নির্বাচনী ব্যবস্থার কারিগরি আলোচনার পাশাপাশি নাগরিকেরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন কি না এবং সাংবাদিকেরা কারাবাসের ভয় ছাড়া কাজ করতে পারছেন কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

জিগফ্রিড ও. উলফ: বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও শিক্ষার স্বাধীনতা রক্ষা জরুরি

জার্মানির সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের গবেষণা পরিচালক ড. জিগফ্রিড ও. উলফ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশে তাঁর দীর্ঘদিনের শিক্ষাদান, গবেষণা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে রাজনৈতিক পরিচয় আরোপ, ভয়ভীতি এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসকদের ওপর চাপের অভিযোগ উদ্বেগজনক।

উলফের দাবি, কাউকে ‘ফ্যাসিবাদের সহযোগী’ কিংবা ‘আওয়ামী লীগপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করে হয়রানি, বহিষ্কার বা শারীরিক আক্রমণের পরিবেশ তৈরি করা হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বাধীনতা এবং চাপের মুখে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের পদত্যাগের অভিযোগও তিনি তুলে ধরেন।

তিনি আরও বলেন, আদর্শিক মেরুকরণ ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার প্রভাব ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নারীর স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাঁর মতে, শিক্ষার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা, শারীরিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ভয়ভীতি থেকে সুরক্ষা অপরিহার্য।

শিনিচি ফুজিকি: আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করতে হবে

জাপানের মানবাধিকারকর্মী শিনিচি ফুজিকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মৌলিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জাপান ইন্টারন্যাশনাল ক্যারিয়ার সাপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিত্ব করে তিনি নির্বিচার আটক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ জোরদারের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘের বিভিন্ন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ উত্থাপনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি সাংবাদিক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং আইনি কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

বিশেষভাবে মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ফুজিকি বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই এ ধরনের শাস্তির ক্ষেত্রে ন্যায্য বিচারের আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা কঠোরভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৪ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, অনুপস্থিতিতে বিচার, প্রমাণ যথাযথভাবে প্রকাশ না করা, প্রতিরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং কার্যকর আপিলের সুযোগের অভাব গুরুতর ন্যায্য-বিচারসংক্রান্ত উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

তিনি পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন—নির্বিচার আটক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা পর্যালোচনা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, আন্তর্জাতিক ন্যায্য-বিচারের মানদণ্ড অনুসরণ, সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ জোরদার করা।

কার্ল গুস্তাভ বিয়ার্টনেস: উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষের মর্যাদা ও ন্যায়বিচার

সিডস-আফ্রিকার সভাপতি কার্ল গুস্তাভ বিয়ার্টনেস বলেন, কোনো দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। সাধারণ মানুষ নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারছেন কি না, ন্যায্য আচরণ পাচ্ছেন কি না, শিক্ষার সুযোগ এবং সম্মানজনক জীবিকার ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

তিনি অর্থনৈতিক অবস্থা ও ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারের সম্পর্ক তুলে ধরে বলেন, দরিদ্র মানুষের পক্ষে অভিযোগের প্রকৃতি বোঝা, আইনজীবী নিয়োগ করা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার সময় কর্মসংস্থান ধরে রাখা তুলনামূলকভাবে কঠিন হতে পারে।

তাঁর মতে, দারিদ্র্য কখনো অপরাধের সমার্থক হতে পারে না। প্রকৃত অপরাধের জন্য ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে শোষণ থেকে রক্ষা করাও জরুরি।

কারাগারে অতিরিক্ত বন্দি, বিচারাধীন ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন আটক থাকা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিলম্ব নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য স্বাধীন অর্থায়নে একটি মূল্যায়ন মিশন গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি, যা আটকপ্রক্রিয়া, কারাগারের পরিবেশ, চিকিৎসাসেবা, নিরাপত্তা, পুনর্বাসন ও তদারকি ব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে।

আলফ্রেড ডি জায়াস: বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জাতিসংঘের ব্যবস্থা কাজে লাগানোর আহ্বান

জেনেভা স্কুল অব ডিপ্লোম্যাসির অধ্যাপক, জাতিসংঘের সাবেক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের সাবেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অধ্যাপক আলফ্রেড ডি জায়াস বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র পাওয়ার অধিকার রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জাতিসংঘের বিদ্যমান মানবাধিকার ব্যবস্থাগুলো আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

নির্যাতন, নির্বিচার আটক, জোরপূর্বক গুম এবং বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতাবিষয়ক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডি জায়াস বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি ও সংগঠন প্রাসঙ্গিক তথ্য জমা দিতে পারে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি যথাযথভাবে আন্তর্জাতিক পর্যালোচনার আওতায় আনার জন্য জেনেভায় সংশ্লিষ্ট বৈঠক ও ফোরামগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

চনসি আয়াচ জোসেফ: সাংবিধানিক সংকট সমাধানের কেন্দ্রে থাকতে হবে আইনের শাসন

ক্যামেরুনের সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস অ্যাডভোকেসির সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী ড. চনসি আয়াচ জোসেফ বলেন, আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে সাংবিধানিক সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় আইনের শাসনকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। আইন হতে হবে সুস্পষ্ট, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য—ব্যক্তির পরিচয় বা অবস্থান অনুযায়ী আইনের প্রয়োগ ভিন্ন হতে পারে না।

নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে সক্ষম হওয়া উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ও রোজা পার্কসের ঐতিহাসিক ভূমিকার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বৈষম্যমূলক আইন ও ব্যবস্থার পরিবর্তনে সমাজের সচেতন ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক বাধ্যবাধকতা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি নাগরিকদের সরকার পরিবর্তনের অধিকার এবং সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র ও নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরেন।

মোনা হাগো স্ট্রিন্ডবার্গ: বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হতে পারে না

সুইডিশ আইনজীবী মোনা হাগো স্ট্রিন্ডবার্গ বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করা বৈধ ও প্রয়োজনীয়। তবে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন বা প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক আইনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় একদিকে যেমন জবাবদিহির প্রয়োজন বাড়ে, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হয়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার সময় সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও তিনি বলেন, যেকোনো জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।

তাঁর মতে, রাজনৈতিক পরিচয়, সামগ্রিক অভিযোগ কিংবা জনমতের চাপ কখনোই কোনো ব্যক্তির অপরাধমূলক দায় প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ৯ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে স্ট্রিন্ডবার্গ বলেন, আটক যেন নির্বিচার না হয় এবং আটক রাখার আইনগত ভিত্তি নিয়মিত ও কার্যকর বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় থাকে।

তিনি মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা শাহরিয়ার কবিরের মামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তাঁকে নিজের মক্কেল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে স্ট্রিন্ডবার্গ জাতিসংঘের নির্বিচার আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের ২০২৫ সালের একটি মতামতের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই মতামতে শাহরিয়ার কবিরের আটক নিয়ে একাধিক ধরনের উদ্বেগ চিহ্নিত করা হয়েছিল।

স্ট্রিন্ডবার্গ বলেন, কোনো ব্যক্তির আটকের আইনগত ভিত্তি, আটক অব্যাহত রাখার কারণ, বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে আটকের সম্পর্ক যথাযথভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যক্তিগত প্রমাণের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত না করে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে প্রকৃত ন্যায়বিচারের পরিবর্তে বেছে বেছে বিচার করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে, যা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করবে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার আহ্বান

সেমিনারে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সাংবিধানিক শাসন, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, শিক্ষার অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আটকব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে মতবিনিময় করেন।

অনুষ্ঠানে মানবাধিকারকর্মী ও জেনেভা প্রেস ক্লাবের সদস্য রহমান মামুন উপস্থিত ছিলেন এবং আলোচনা পরিচালনায় অংশ নেন।

আয়োজকদের মতে, সেমিনারটির উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার একটি পরিসর তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আইন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় জোরদার করা।

সেমিনারে আইনের শাসন, ন্যায্য বিচার, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকদের সুরক্ষার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মনোযোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সেমিনারের আলোচনায় একটি মৌলিক প্রশ্নই বারবার উঠে আসে—রাজনৈতিক পরিবর্তন ও জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় কীভাবে আইনের শাসন, ব্যক্তির মৌলিক অধিকার এবং নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। বক্তাদের বক্তব্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বজায় রাখা এবং অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, প্রমাণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির দায় নির্ধারণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

More from the timeline

View all