গোপালগঞ্জ—যে শহর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমি, যে জেলা বাংলাদেশের ঐতিহ্য, গৌরব ও ইতিহাসের প্রতীক—সেটিই ১৬ জুলাই রূপ নিল রক্তাক্ত সমাধিক্ষেত্রে। শান্তি ও মর্যাদার জায়গায় প্রতিধ্বনিত হলো গুলির শব্দ, ন্যায়ের জায়গায় ঝরল নিরীহ মানুষের রক্ত।
এটি কোনো আকস্মিক সংঘর্ষ ছিল না। এটি ছিল পরিকল্পিত শক্তি প্রদর্শন—মানুষকে রক্ষা করার জন্য নয়, বরং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর নেতাদের বাঁচানোর জন্য। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে থাকা মুহাম্মদ ইউনুসের ছায়াতেই এই রক্তাক্ত নাটক মঞ্চস্থ হয়।
কেন গুলি চালালো সেনারা?
২০২৪ সালের আগস্টের গণআন্দোলনে সেনারা গুলি চালাতে অস্বীকার করেছিল। তারা সংযম দেখিয়েছিল, সেদিন গর্বিত হয়েছিল সমগ্র দেশ। কিন্তু এবার? গোপালগঞ্জের রাস্তায় একই সেনারা নির্মমভাবে গুলি চালাল—নিরস্ত্র মানুষদের ওপর, যারা কেবল স্লোগান দিচ্ছিল কিংবা ঘটনাস্থলের আশেপাশে ছিল।
প্রশ্ন জাগে: সেনারা কি এখন ইউনুসের পক্ষ নিয়েছে? তারা কি এখন জনগণের নয়, বরং একদল অনির্বাচিত শাসকের রক্ষক?
রক্তাক্ত ১৬ জুলাই: কীভাবে ঘটল হত্যাযজ্ঞ
সকাল: উসকানির সূচনা
গোপালগঞ্জের আবেগ ও ইতিহাসকে উপেক্ষা করে এনসিপি নেতারা সকালে শুরু করল তাদের সমাবেশ। সেখানে বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার ও তাঁর পরিবারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কিত ও আক্রমণাত্মক বক্তৃতা দেওয়া হয়। স্থানীয় মানুষদের হৃদয়ে আঘাত লাগে।
অরাজনৈতিক মানুষও তখন প্রতিবাদে উত্তেজিত হয়ে ওঠে।
দুপুর: উত্তেজনা থেকে সংঘর্ষ
দুপুরের পর এনসিপির শোভাযাত্রা যখন শহর ছাড়তে চাইছিল, তখন গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের সামনে ও প্রধান সড়কগুলোতে ক্ষুব্ধ মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। গাড়ি ভাঙচুর হয়, স্লোগান ওঠে বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা রক্ষার দাবিতে।
বিকেল: গুলি আর লাশ
বিকেল ২টা ৩০ মিনিটের দিকে নিরাপত্তা বাহিনী ভিড় সামলাতে টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে। কিছুক্ষণ পরই ছোড়া হয় গুলি—সরাসরি মানুষের বুকে, পিঠে, মাথায়।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অন্তত পাঁচজন। তাদের অনেকেই ছিল দোকানপাটে বা কাজের জায়গায় থাকা সাধারণ মানুষ।
সন্ধ্যা: কারফিউ আর নিস্তব্ধতা
রাত ৮টার পর গোটা শহরে কারফিউ জারি হয়। এনসিপি নেতারা পুলিশের সুপারের কার্যালয়ে আশ্রয় নেয় এবং পরে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান দিয়ে নিরাপদে শহর থেকে বেরিয়ে যায়। অথচ শহরের মানুষ রইল লাশ আর শোকের ভার নিয়ে।
রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ: কে দিল গুলি চালানোর নির্দেশ?
ঘটনার পরপরই আইএসপিআর দাবি করে—“অশান্ত উপাদানদের” দমন করতেই গুলি চালানো হয়েছে। কিন্তু ভিডিও প্রমাণ অন্য কথা বলে—স্লোগান দেওয়া নিরস্ত্র মানুষদের গুলিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বাসযোগ্য সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অনির্বাচিত উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সেনাদের গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। গত বছর যে সেনারা গুলি চালাতে অস্বীকার করেছিল, এবার তারাই নির্বিচারে মানুষ হত্যা করল।
ইউনুসের কৌশল: মিছিল পাহারা, জনগণকে হত্যা
এনসিপি নেতাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো। নেতাদের পুলিশ অফিসে আশ্রয় ও পরে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হলো, অথচ গোপালগঞ্জবাসী পেল লাশ, রক্ত আর ভয়ের রাজত্ব।
এটি কোনো আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ নয়, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস—জনগণকে ভয় দেখানো ও বিদ্রোহী কণ্ঠ স্তব্ধ করার নির্মম নীতি।
দমননীতি: গ্রেপ্তার, কারফিউ, ভয়ের শাসন
রক্তপাতের পরপরই শুরু হলো দমননীতি। রাতারাতি ১৬০ জনের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হলো, হাজার হাজার অজ্ঞাত নামের বিরুদ্ধে মামলা হলো। সেনা ও পুলিশ টহল দিল শহর জুড়ে—যেন এক দখলীকৃত নগর।
জনগণের প্রশ্ন: এ কেমন সরকার?
১৬ জুলাইয়ের হত্যাযজ্ঞ কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি প্রমাণ করে, মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার জনগণ নয়, কেবল ক্ষমতা বাঁচানোর জন্য কাজ করছে। গণতন্ত্রের নামে চলছে সেনাশাসন, আর প্রতিবাদের জবাব দেওয়া হচ্ছে গুলি ও কারফিউ দিয়ে।
গোপালগঞ্জে ঝরানো রক্ত শুধু শহরের মানুষ নয়, পুরো জাতিকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে। এখন দেশের মানুষ একটাই প্রশ্ন করছে—এ সরকার কি জনগণের, নাকি শুধু ইউনুস ও তার রাজনৈতিক মিত্রদের?
বিশ্ব তাকিয়ে আছে। এবং এ রক্তের দায় কোনো বিবৃতি বা অজুহাত দিয়ে মুছে ফেলা যাবে না।