গণভোটের নামে কাগুজে কারসাজি: ভোটার নেই, কিন্তু ভোট আছে — শতাংশও ছাড়িয়েছে বাস্তবতাকে
যা একটি সাংবিধানিক গণভোট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সমালোচকদের ভাষায় সেটি ছিল কেবল কাগুজে আয়োজন—একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বিতর্কিত ইউনূস সরকারের অধীনে পূর্বনির্ধারিত ফলাফলে বৈধতার আবরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের দাবি, সংখ্যাকে যেভাবেই সাজানো হোক না কেন, অসত্য শেষ পর্যন্ত অসত্যই থেকে যায়। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিছু আসনে এমন পরিসংখ্যান উঠে এসেছে যা গণিত, বাস্তবতা ও সাধারণ বোধ—সবকিছুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রাজশাহী–৪: ভোটারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ভোট?
রাজশাহী–৪ আসনে মোট নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ৩,১৯,৯০৯। অথচ গণভোটে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৭,৮১,৫২৩—যা ২৪৪.২৯৫ শতাংশ! অর্থাৎ, ভোটারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ভোট কাস্ট হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে।
ঘোষিত ফল অনুযায়ী, ‘না’ ভোট ৬,১২,২২৯ এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট ১,৪৫,৩৮২। সমালোচকদের প্রশ্ন—যেখানে মোট ভোটারই প্রায় তিন লাখ বিশ হাজার, সেখানে সাত লাখের বেশি ব্যালট এল কোথা থেকে? এটি কি কেবল টাইপিং ভুল, নাকি আরও গভীর কোনো অনিয়মের ইঙ্গিত?
উল্লেখ্য, এই আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন Abdul Bari Sardar, যিনি Bangladesh Jamaat-e-Islami-এর প্রার্থী ছিলেন। ফলে একই কেন্দ্রে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তুলনা টানা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ–১: একই দিনে ভোট, কিন্তু উপস্থিতিতে আকাশ-পাতাল ফারাক?
সিরাজগঞ্জ–১ আসনে সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে ৬০.৮৩ শতাংশ। অথচ একই দিন, একই ভোটকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত গণভোটে উপস্থিতি মাত্র ৭.৮৯৯ শতাংশ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
সমালোচকদের প্রশ্ন—একই ভোটার, একই কেন্দ্র, একই দিন। তাহলে সংসদ নির্বাচনে ৬০ শতাংশের বেশি উপস্থিতি, আর গণভোটে মাত্র ৭ শতাংশ—এই বিপরীতমুখী চিত্র কীভাবে সম্ভব? এটি কি তথ্যসংগ্রহের ত্রুটি, নাকি ফলাফলের অমিল?
এই আসনে নির্বাচিত হয়েছেন Selim Reza, যিনি Bangladesh Nationalist Party-এর প্রার্থী। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বৈপরীত্য কেবল পরিসংখ্যানগত নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও তৈরি করছে।
নেত্রকোনা–৩, ৪ ও ৫: ‘হ্যাঁ’ ভোটই ছাড়িয়েছে মোট ভোটার সংখ্যা
নেত্রকোনা–৩ আসনে মোট ভোটার ৪,২০,৬৮৬। অথচ ঘোষিত ফলাফলে ‘হ্যাঁ’ ভোটই দেখানো হয়েছে ৫,০২,৪৩৮—যা মোট ভোটারের সংখ্যাকেই অতিক্রম করে। আবার মোট প্রদত্ত ভোট দেখানো হয়েছে ২,৩৮,৩৫৮, কাস্টিং রেট ৫৬.৬৫৯ শতাংশ।
সমালোচকদের মতে, এখানে সংখ্যাগুলো পরস্পরবিরোধী। একদিকে ‘হ্যাঁ’ ভোট মোট ভোটারের চেয়ে বেশি, অন্যদিকে মোট কাস্ট ভোট তার চেয়ে অনেক কম—এমন হিসাব কীভাবে সম্ভব? একই ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে নেত্রকোনা–৪ ও ৫ আসনেও।
পূর্বনির্ধারিত ফলাফল নাকি প্রশাসনিক ব্যর্থতা?
বিরোধী মহলের দাবি, এসব পরিসংখ্যান কেবল বিচ্ছিন্ন ভুল নয়; বরং একটি “সেট রেজাল্ট”-এর ইঙ্গিত বহন করে। কোথাও ২০০ শতাংশের বেশি উপস্থিতি, কোথাও অস্বাভাবিক কম ভোটার উপস্থিতি—এই চিত্র তারা দেখছেন একটি পূর্বপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে।
তাদের ভাষায়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মূল শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। যদি ভোটার সংখ্যাই বাস্তবতার সঙ্গে না মেলে, তবে সেই ফলাফলকে বৈধতা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তারা আরও দাবি করেন, বৃহৎ অংশের ভোটার এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের দূরে রেখেছেন—যা একটি নীরব অনাস্থা বা বর্জনের বার্তা বহন করে।
সবশেষে প্রশ্নটি থেকে যায়—এটি কি কেবল তথ্যপ্রকাশের ত্রুটি, নাকি একটি গভীরতর আস্থাসংকটের প্রতিফলন? কারণ গণতন্ত্রে কেবল ফলাফল নয়, প্রক্রিয়াটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর যখন সংখ্যাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে, তখন সেই গণভোটের গ্রহণযোগ্যতাও স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।