ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনকে একটি “গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তন” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ—দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল এবং প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তিকে নিষিদ্ধ করে—মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার কার্যত কোটি কোটি নাগরিককে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাইরে ঠেলে দিয়েছে।
যে নির্বাচন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক হতে পারে না। এটি একটি পরিকল্পিত, নিয়ন্ত্রিত ও পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া—গণতন্ত্রের নামে রাজনৈতিক প্রকৌশল।
নিষেধাজ্ঞা মানে সংস্কার নয়, গণবঞ্চনা
নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করা এবং পরে ইউনুস প্রশাসনের আইনি নিষেধাজ্ঞা কোনো নিরপেক্ষ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ ছিল না। এটি ছিল একটি হিসাবি রাজনৈতিক আঘাত। মুক্ত ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতায় আওয়ামী লীগকে পরাজিত করতে অক্ষম হয়ে সরকার প্রতিযোগিতাকেই তুলে দিয়েছে।
কোনো বিশ্বাসযোগ্য গণতন্ত্র তার সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে বৈধতার দাবি করতে পারে না। গণতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়; স্বৈরতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই সীমারেখা অতিক্রম করে ইউনুস সরকার রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক অস্ত্রে এবং নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রিত আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করেছে।
এখানে ভোটারদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে কোনো অপরাধের জন্য নয়—তারা কাকে সমর্থন করে, সেই অপরাধে। তাদের ব্যালট ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। যে সরকার ভোটারকে ভয় পায়, সে সরকার নির্বাচনের ওপর আস্থা রাখে না। সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয় না—ধসে পড়ে।
“অতীতের নির্বাচন” নিয়ে ইউনুসের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার যৌক্তিকতা দেখাতে ইউনুস সরকার অতীতের নির্বাচনগুলোর দিকে আঙুল তোলে। কিন্তু এই যুক্তি সামান্য যাচাইও টেকে না। শেখ হাসিনার সময়ে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—কোনো নির্বাচনেই একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকেও নিষিদ্ধ করা হয়নি। সকল দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আইনি অধিকার অক্ষুণ্ণ ছিল।
যেখানে অংশগ্রহণ কম ছিল, তা ছিল রাজনৈতিক বয়কটের ফল—রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞার নয়। অংশ না নেওয়া আর অংশ নিতে না দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য গুলিয়ে ফেলা ইচ্ছাকৃত ও বিভ্রান্তিকর।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও এই বাস্তবতা স্বীকার করেছেন। বিরোধীরা না এলেও নির্বাচনী মাঠ আইনগতভাবে খোলা ছিল। রাষ্ট্র প্রতিপক্ষকে মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিজয় নির্ধারণ করেনি।
এইখানেই মূল পার্থক্য। হাসিনা প্রতিযোগিতার সুযোগ দিয়েছিলেন; ইউনুস সেই প্রতিযোগিতাকেই ধ্বংস করছেন। এটি কোনো গণতান্ত্রিক সংশোধন নয়—এটি গণতন্ত্র থেকে পশ্চাদপসরণ, সংস্কারের ছদ্মবেশে অবক্ষয়।
চরমপন্থা ও অপরাধী রাজনীতির জন্য মাঠ পরিষ্কার
ইউনুস কেন ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে কোনোভাবেই দেখতে চান না—এর কারণ স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক। আওয়ামী লীগের উপস্থিতি থাকলে ইসলামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠী ও দুর্নীতিগ্রস্ত অপরাধী নেটওয়ার্কের ক্ষমতায় আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থাকতে পারে, কিন্তু মূল কৌশল হলো বর্জন—কারণ আওয়ামী লীগকে সরানো ছাড়া এই শক্তিগুলোর ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়।
জামায়াত-ই-ইসলামীর মতো ইসলামপন্থী দলগুলো কখনোই মুক্ত নির্বাচনে জাতীয় ম্যান্ডেট পায়নি। তাদের আদর্শ, ইতিহাস ও চরমপন্থার ঘনিষ্ঠতা শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্পের সামনে তাদের প্রান্তিক করে রেখেছিল। সেই বিকল্পকে জোর করে মুছে ফেলার পর চরমপন্থী রাজনীতি স্বাভাবিক করে তোলা হচ্ছে।
ইউনুসের আমলে ইসলামপন্থী শক্তির সঙ্গে জোট আর লজ্জার বিষয় নয়; বরং গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এভাবেই চরমপন্থা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে ঢোকে—জনসমর্থন জিতে নয়, কৃত্রিম শূন্যতার সুযোগ নিয়ে।
একই প্রকৌশল দেখা যাচ্ছে তারেক রহমানের পুনর্বাসনে। দুর্নীতি, অস্ত্র চোরাচালান, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, জঙ্গি সংযোগ ও অর্থপাচারের অভিযোগে যার রাজনৈতিক পরিচয় বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল, তাকে এখন “স্বাভাবিক” রাজনীতিতে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। যখন ভোটারদের সামনে প্রকৃত বিকল্প ছিল, তারা এই রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
আজ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় সেই জনরায় আর প্রাসঙ্গিক নয়। এটি কোনো গণতান্ত্রিক রূপান্তর নয়; এটি রাজনৈতিক ‘লন্ডারিং’—যেখানে চরমপন্থা ও দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত বর্জনের মাধ্যমে।
ইউনুস কোনো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক নন। তিনি সচেতনভাবে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র নতুন করে সাজাচ্ছেন—ধর্মনিরপেক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে সরিয়ে চরমপন্থা ও অপরাধী শক্তিকে সামনে আনছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান: এই নির্বাচনকে বৈধতা দেবেন না
যখন নির্বাচন থেকে প্রকৃত পছন্দ তুলে নেওয়া হয়, তার ক্ষতি শুধু ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইতিহাস পরিষ্কার—প্রতিযোগিতাহীন নির্বাচন চরমপন্থাকে ত্বরান্বিত করে, রাজনৈতিক সহিংসতাকে বৈধতা দেয় এবং ভোটের ওপর মানুষের বিশ্বাস ধ্বংস করে।
বাংলাদেশ এখন সেই পথেই হাঁটছে। প্রবাসী ভোটাররা উপেক্ষিত, দেশের ভেতরের কোটি কোটি ভোটার ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ছে, ধর্মনিরপেক্ষ কণ্ঠগুলো মুছে ফেলা হচ্ছে। এর ফল অংশগ্রহণ নয়—বিচ্ছিন্নতা; স্থিতিশীলতা নয়—ক্ষোভ।
এটি তাত্ত্বিক বিপদ নয়। রাজনৈতিক বর্জনের একটি ধারা আছে, এবং তা সচরাচর সংযমে শেষ হয় না। বহুত্ববাদ ধ্বংস হলে দেশ ধীরে ধীরে তালেবান-ধাঁচের বর্জনমূলক রাজনীতির দিকে গড়ায়—যেখানে বৈধতা আসে ভোটার থেকে নয়, আদর্শিক আধিপত্য ও বলপ্রয়োগ থেকে।
এই দায়িত্ব এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও। অন্তর্ভুক্তি ছাড়া পর্যবেক্ষণ মানে নীরব সম্মতি।
আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন গণতন্ত্র নয়—এটি গণতন্ত্রের আত্মহত্যা।
আর এর পরিণতি কোনো এক দেশের সীমানায় আটকে থাকবে না।