কোনো আদালত নয়, কোনো ন্যায়বিচার নয়: আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নগ্ন রাজনৈতিক দমন অভিযান
বাংলাদেশে গণতন্ত্র যেন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার এক উদ্বেগজনক চিত্র বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। রাতারাতি দলটির সব রাজনৈতিক কার্যক্রম, জনসভা, প্রকাশনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশ—এমনকি যেকোনো ধরনের সমর্থন—অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করে, ফলে ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়।
এটি কোনো আইনগত প্রক্রিয়া নয়—এটি ছিল নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমে রাজনৈতিক নির্মূলের এক নির্মম উদাহরণ।
আইনকে উপেক্ষা: নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই। ১৯৭৮ সালের রাজনৈতিক দলসমূহ অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করতে হলে হাইকোর্টে রেফারেন্স দিতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট দলকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়। কিন্তু এসব মৌলিক আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।
পরিবর্তে ২০২৫ সালের ১২ মে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধনী) অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকার অসীম ক্ষমতা অর্জন করে। এই আইনের আওতায় কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী ঘোষণা না করেই তাদের সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত বা নিষিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল ভেঙে দেওয়া এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও যুক্ত করা হয়—যা সংসদীয় বিতর্ক বা জনমতের কোনো প্রতিফলন ছাড়াই কার্যকর করা হয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দমন-পীড়ন
এই সিদ্ধান্তের মানবিক মূল্য ছিল ভয়াবহ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পরিচালিত “ডেভিল হান্ট” অভিযানে চার লাখের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বছরের শেষ নাগাদও হাজার হাজার মানুষ কারাগারে ছিল। সাংবাদিক, আইনজীবী এবং সাধারণ সমর্থকরাও এই দমন-পীড়নের শিকার হন। নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু এবং বিচারবহির্ভূত আচরণের অভিযোগও সামনে আসে।
এটি ছিল আইনের শাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত—একটি সমষ্টিগত শাস্তি, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
জাতিসংঘের কঠোর সমালোচনা
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা (যোগাযোগ নম্বর AL BGD 6/2025) এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, এই নিষেধাজ্ঞা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR)-এর বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘন করেছে, যেমন—
- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
- সমাবেশের অধিকার
- সংগঠনের স্বাধীনতা
- নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার
জাতিসংঘ স্পষ্টভাবে জানায়, একটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ এবং তা কেবলমাত্র চরম প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে, যথাযথ প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু এখানে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।
সংসদীয় বৈধতা: গণতন্ত্রের জন্য হুমকি
২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধনী) বিল পাস করে এই নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী আইনে রূপ দেয়। তড়িঘড়ি করে, কোনো কার্যকর আলোচনা ছাড়াই এই আইন পাস করা হয়।
এটি গণতন্ত্রের জন্য কয়েকটি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে—
- সংবিধানের মূল চেতনার লঙ্ঘন: বহুদলীয় গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ক্ষুণ্ন হয়েছে
- রাজনৈতিক প্রতিশোধের চক্র: বিরোধী দলকে দমন করে ক্ষমতা স্থায়ী করার প্রবণতা
- ঐতিহাসিক অবমাননা: স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দলকে বিচার ছাড়া নিষিদ্ধ করা
- আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: ICCPR-এর বাধ্যবাধকতা অমান্য করা
ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
আওয়ামী লীগ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়। এটি সেই দল, যার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দল দেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
একটি এমন দলকে কোনো বিচারিক রায় ছাড়াই “সন্ত্রাসী” আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন নয়—এটি ইতিহাস ও গণতন্ত্রের ওপর আঘাত।
সামনে পথ
বাংলাদেশের গণতন্ত্র টিকে থাকতে হলে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বচ্ছ, বিচারিক এবং ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের জনগণ একটি অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের যোগ্য—যেখানে সব রাজনৈতিক শক্তি সমান সুযোগে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—জনগণের সমর্থনকে কখনো স্থায়ীভাবে দমন করা যায় না। গণতন্ত্রের শ্বাসরোধ যতই করা হোক, তা শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে জনগণের ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমেই।