নিরাপত্তাহীন হেফাজত, ভয়ের প্রতীক হয়ে উঠছে আটক
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারাগার ও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। যে হেফাজত আইন অনুযায়ী নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রতীক হওয়ার কথা, তা এখন ক্রমেই আতঙ্কের উৎসে পরিণত হয়েছে। মানুষ জীবিত অবস্থায় গ্রেপ্তার হচ্ছে, আর পরিবারের কাছে ফিরছে নিথর দেহ। এসব মৃত্যুর পর কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যা অস্পষ্ট, দায়হীন এবং প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ।
যে সময়টিকে সংস্কার ও মানবিক শাসনের সূচনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেই সময়ই রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব—হেফাজতে থাকা নাগরিকের প্রাণরক্ষা—চরমভাবে ভেঙে পড়েছে।
‘মৃত্যুর উৎসব’: বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর বিস্তার
এটি কোনো তাত্ত্বিক মানবাধিকার বিতর্ক নয়; এটি বাস্তব লাশের হিসাব। পরিসংখ্যান ও ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট—আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এই মৃত্যুমিছিলে বারবার উঠে আসছেন। রাজনৈতিক মামলায় আটক, দীর্ঘদিন রিমান্ডে রাখা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা না দেওয়া—এরপর মৃত্যু। আর মৃত্যুর পর নিয়মিত ব্যাখ্যা: “অসুস্থতা”, “আত্মহত্যা” কিংবা “আগের আঘাত”।
এই ধারাবাহিকতা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার এক ভয়াবহ সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে হেফাজত মানেই দায় শেষ হয়ে যাওয়া।
ভাঙা প্রতিশ্রুতি, এড়ানো দায়
ইউনূস সরকার ক্ষমতায় এসেছিল আশার বার্তা দিয়ে—সংযম, সংস্কার ও অতীতের অপব্যবহার থেকে সরে আসার অঙ্গীকার নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে সেই আশা এখন প্রতারণা বলে প্রতীয়মান। পরিবর্তন আনার ব্যর্থতাই নয়, বরং আশ্বাস দিয়ে নীরবে সহিংসতা চলতে দেওয়ার দায় এ সরকার এড়াতে পারে না।
তদন্তের নির্দেশ না দেওয়া, সংস্কারে উদ্যোগ না নেওয়া, দায় নির্ধারণে অনীহা—সব মিলিয়ে এই সরকার হেফাজতে মৃত্যুকে কার্যত স্বাভাবিক করে তুলেছে। আজকের বাংলাদেশে গ্রেপ্তার মানে আর আইনের সুরক্ষা নয়; বরং এমন এক রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া, যে রাষ্ট্র বন্দির প্রাণ বাঁচাতে ব্যর্থ।
সংখ্যা যা লাশের ভাষায় কথা বলে
গত এক বছরে অন্তত
-
কারাগারে মৃত্যু: ১১৯ জন
-
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু: ২১ জন
-
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড: ২৬ জন
-
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত: ১০৬ জন
এই সংখ্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ইঙ্গিত। বিভিন্ন কারাগার ও থানায় বারবার একই ধরনের মৃত্যু প্রমাণ করে—এটি ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।
রাষ্ট্র কাউকে হেফাজতে নিলে তার জীবন ও সুস্থতার পূর্ণ দায় রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। অসুস্থতা, আগের আঘাত বা আত্মহত্যার অজুহাতে সেই দায় এড়ানো যায় না। প্রতিটি হেফাজতে মৃত্যু স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি দাবি করে। সেই দাবি পূরণে ইউনূস সরকার ব্যর্থ।
কেন বেশি মরছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা
এই সংকটের ভেতরে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ধারা রয়েছে—আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা disproportionately মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন। হাজার হাজার রাজনৈতিক মামলা, গণগ্রেপ্তার, দীর্ঘ আটক—সব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়কে লক্ষ্য করে হেফাজতকে শাস্তির অস্ত্রে রূপ দেওয়া হয়েছে।
দুর্বল অভিযোগ, দীর্ঘ রিমান্ড, আইনজীবীর সীমিত সুযোগ, চিকিৎসার অবহেলা—এসব বিচ্যুতি নয়; বরং একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ। ফলাফল অনুমেয়: গ্রেপ্তারের পর শারীরিক অবনতি, অবহেলা এবং মৃত্যু।
এটি কাকতাল নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া—গ্রেপ্তার, কঠোর হেফাজত, অবহেলা, মৃত্যু, তারপর দায় এড়িয়ে যাওয়া।
অস্বীকার, অজুহাত এবং রাজনৈতিক অপরাধ
প্রতিটি মৃত্যুর পর একই চিত্র—রাষ্ট্রের অস্বীকার, যান্ত্রিক বিবৃতি, অভ্যন্তরীণ তদন্তের আশ্বাস, কিন্তু কোনো দৃশ্যমান জবাবদিহি নেই। পরিবারগুলো পায় নির্যাতনের চিহ্নসহ লাশ, কিন্তু পায় না সত্য।
এই নীরবতাই আজ সরকারের নীতি। স্বাধীন তদন্ত নেই, সংস্কারের সদিচ্ছা নেই, শাস্তির নজির নেই। ফলে হেফাজতে মৃত্যু আর ব্যতিক্রম নয়—এটি এখন নিয়মে পরিণত হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় দায় ও অনিবার্য সত্য
হেফাজতে মৃত্যুগুলো আর প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যায় না। এগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। তদন্ত না করা, সংস্কার না আনা, দায় না নেওয়ার মাধ্যমে ইউনূস সরকার এই মৃত্যুর সঙ্গে নৈতিকভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
যে রাষ্ট্র বন্দির প্রাণ রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্র তার নৈতিক কর্তৃত্ব হারায়। সেই বাস্তবতায়, কারাগারের ভেতরের এই মৃত্যুমিছিলই আজ ইউনূস সরকারের শাসন ব্যর্থতার সবচেয়ে নির্মম প্রমাণ।