প্রায় প্রতিদিনই নতুন শিরোনাম—কোথাও নতুন মামলা, কোথাও আবার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, কিংবা এন্টি-করাপশন কমিশন (এ’সিসি)-এর নতুন প্রেস ব্রিফিং। এবার শুধু শেখ হাসিনা নন, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, এমনকি ছোট বোন শেখ রেহানা ও তার সন্তানদেরও এই অভিযানের টার্গেটে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ন্যায়বিচারের চেয়ে বরং পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারণার মতোই মনে হচ্ছে।
টিউলিপ সিদ্দিক স্পষ্টভাবে বলেছেন—এই সব দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক।
সাজানো নাটকের মতো ধাপ ধাপ
একদিন ঘোষণা আসে হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। আরেকদিন হঠাৎ আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তারপর প্লট-আবণ্টন মামলার সাক্ষ্য, নতুন দুর্নীতির গল্প আর মিডিয়ায় তোলপাড়—সবকিছু যেন এক ধরনের চিত্রনাট্য অনুসারে সাজানো। এদিকে জয় সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন এ’সিসিকে: প্রমাণ থাকলে সামনে আনুক। ফলে গোটা প্রক্রিয়াটি বিচার নয়, বরং রাজনৈতিক নাটকের মঞ্চায়ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণ নাটক
অস্থায়ী সরকার ও এ’সিসি মিলে শেখ হাসিনার আইনি লড়াইকে রূপ দিয়েছে পূর্ণাঙ্গ জন-নাটকে। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন রাজনৈতিক থ্রিলারের দৃশ্য। “এক্সক্লুসিভ তথ্য ফাঁস”, “আদালতের নির্দেশ”, “সরকারি বিবৃতি”—সবকিছুই মিডিয়ায় প্রচার করে হাসিনার ভাবমূর্তিকে জনগণের চোখে আগেভাগেই দোষী হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে।
সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হলো ভারত থেকে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি। সংবাদ শিরোনামে “গ্রেপ্তারি পরোয়ানা” ও “অনুপস্থিতিতে বিচার”—এমন শব্দ ব্যবহার করে তাকে পালিয়ে বেড়ানো আসামি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আইনি ভিত্তি, অপরাধের প্রমাণ এবং দুই দেশের সহযোগিতা—যার কোনোটিই এখনো স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়নি।
এই নাটক আরও তীব্র হয় যখন আদালত তড়িঘড়ি করে পরোয়ানা জারি করে, আর এ’সিসির বিবৃতিতে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় ভয় দেখানো হয়। এর মাধ্যমে শুধু হাসিনাই নন, তার পুরো পরিবার—সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ রেহানা ও তার সন্তানদেরও আতঙ্কে রাখা হচ্ছে।
রেড নোটিশ খেলা
দেশের ভেতরে আইনি নাটকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ’সিসি সাজিয়েছে “রেড নোটিশ খেলা”। ইন্টারপোলের কাছে শেখ হাসিনা, তার ছেলে জয় ও মেয়ে পুতুলের বিরুদ্ধে নোটিশ জারির চেষ্টায় নাম-পরিচয়, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য পাঠানো হয়েছে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট—তাদের বিশ্বজুড়ে “পলাতক” হিসেবে চিত্রিত করা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইন্টারপোল নোটিশ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। এগুলো কার্যকর হতে হলে শক্ত প্রমাণ ও অপরাধের নিশ্চয়তা থাকতে হয়। ভারত বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে কখনোই এমন পদক্ষেপ নেবে না। ফলে এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ন্যায়বিচার নয়, বরং প্রচারণা—দেশের জনগণকে দেখানো যে সরকার যেকোনোভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।
আদালত ও মিডিয়ার নাটকীয়তা
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিচার এখন আদালতের বদলে মঞ্চায়িত নাটকের মতো। পূর্বাচল প্লট মামলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাক্ষ্য দেওয়া হলেও অভিযুক্তরা বিদেশে থেকে নিজেদের পক্ষে কোনো কথা বলার বা জেরা করার সুযোগ পাচ্ছেন না। আদালত যেন হয়ে উঠেছে দর্শকপূর্ণ নাট্যমঞ্চ, আর মিডিয়া হয়ে উঠেছে প্রচারণার হাতিয়ার।
রূপপুর প্রকল্প থেকে শুরু করে আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যন্ত নানা অভিযোগ আনা হলেও বাস্তবে রাশিয়ার রোসাটম কিংবা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বিভাগ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু সেসব তথ্য মিডিয়ার নাটকীয় প্রচারণায় চাপা পড়ে যায়।
নাটকের পেছনের রাজনৈতিক লক্ষ্য
এই সাজানো নাটকের লক্ষ্য তিনটি—
-
শেখ হাসিনা ও তার উত্তরাধিকারকে কলঙ্কিত করা। তার উন্নয়নমূলক কাজ ও অর্জনকে আড়াল করে কেবল “দুর্নীতির প্রতীক” বানিয়ে দেওয়া।
-
পরবর্তী প্রজন্মকে দুর্বল করা। জয় ও পুতুলকে দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়ে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পথ রুদ্ধ করা।
-
অস্থায়ী সরকারের বৈধতা তৈরি। নির্বাচিত নয় এমন শাসনব্যবস্থা নিজেদের নৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হাসিনা ও তার পরিবারকে দোষারোপ করছে।
এটি আসলে বিচার নয়, রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন করে লেখার চেষ্টা। লক্ষ্য স্পষ্ট—হাসিনার অধ্যায় যেন শেষ হয় সম্মানের সাথে নয়, বরং কেলেঙ্কারির কলঙ্কে।