ভয় ও দায়মুক্তির এক ভয়াবহ সময়রেখা
চলতি বছর বড়দিন ঘনিয়ে আসতেই ঢাকার বিভিন্ন গির্জার সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। অনেক খ্রিস্টান পরিবার উৎসব সংক্ষিপ্ত করে, নিজ উদ্যোগে সিসিটিভি বসায় এবং রাতের প্রার্থনা এড়িয়ে চলে। এসব সতর্কতা কেবল নিরাপত্তার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নয়; বরং মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জীবনে নেমে আসা এক নতুন, ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিফলন।
মানবাধিকার সংস্থা, গির্জার নেতৃবৃন্দ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ক্ষুদ্র এক সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে খ্রিস্টানরা এখন নজিরবিহীন আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। ঘৃণামূলক বক্তব্য, বোমা হামলা, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং অপরাধীদের প্রায় সম্পূর্ণ দায়মুক্তি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।
হুমকির ঢল
ডিসেম্বর ২০২৫-এ বিবিসি বাংলার এক অনুসন্ধানে উঠে আসে, বড়দিন ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে সারা দেশে খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে হুমকি চিঠির ঢল নামে। অন্তত ২১টি খ্রিস্টান-সম্পৃক্ত সংগঠন এমন চিঠি পায়, যেখানে কোনো প্রমাণ ছাড়াই মুসলমানদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলা হয়। চিঠিতে গির্জা, ক্যাথেড্রাল, চ্যাপেল ও মিশনারি পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেরকেরা নিজেদের পরিচয় দেয় “তাওহিদি মুসলিম জনতা” নামে—একটি উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠী, যা গত বছর থেকে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। খ্রিস্টান নেতারা জানান, যেসব প্রতিষ্ঠান কয়েক দশক ধরে নির্বিঘ্নে কাজ করেছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেগুলোকেই হঠাৎ করে হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
গির্জা নেতাদের সতর্কবার্তা
ডিসেম্বরের শুরুতেই বাংলাদেশ ক্যাথলিক বিশপ সম্মেলন প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানায়। ঢাকার আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ক্রুজ বলেন, পরিস্থিতি “ক্যাথলিক চার্চের জন্য গভীর উদ্বেগজনক”—বিশেষ করে বড় ধর্মীয় উৎসব ও জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে। ৩ ডিসেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে তাঁরা সরকারকে নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বড়দিনের আগের রক্তাক্ত রাত
২৪ ডিসেম্বর খ্রিস্টানদের আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়। ঢাকায় এক গির্জা প্রাঙ্গণে হামলা চালানো হয়, যেখানে চার্চ অব বাংলাদেশ, ক্রিশ্চিয়ান রিলিজিয়াস অর্ডার ট্রাস্ট ও বাইবেল সোসাইটিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান ছিল। এলাকায় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও হামলায় একজন নিহত হন।
বাংলাদেশ খ্রিস্টান কমিউনিটির সভাপতি নির্মল রোজারিও বলেন, এ ঘটনা সারা দেশের খ্রিস্টানদের গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি এটিকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চলমান গণসহিংসতার বৃহত্তর ধারার অংশ হিসেবে দেখেন। তিনি সাম্প্রতিক এক ঘটনায় এক হিন্দু কিশোরকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত ও হত্যার প্রসঙ্গও টানেন—যেখানে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করেনি।
বোমা হামলা ও লাগামহীন ভয়ভীতি
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বড়দিনের আগের হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ইউনুস ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এমন ঘটনা বাড়ছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গির্জা ও খ্রিস্টান-পরিচালিত স্কুলে ককটেল বা বোমা হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। শুধু গত দুই মাসেই অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে অধিকারকর্মীরা।
যদিও কর্তৃপক্ষ তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে, বাস্তবে গ্রেপ্তার খুব কম বা নেই বললেই চলে। একই সঙ্গে উগ্র গোষ্ঠীগুলো সংখ্যালঘুদের ‘আওয়ামী লীগ সমর্থক’ আখ্যা দিচ্ছে—যা তাদের আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে কমিউনিটি নেতারা জানান।
অর্থনৈতিক নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতি
সহিংসতা শুধু শারীরিক হামলায় সীমাবদ্ধ নয়। জানুয়ারিতে এক খ্রিস্টান ব্যক্তির শূকর খামার স্থানীয় একটি মসজিদের ফতোয়ার পর জনতার হাতে ধ্বংস হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকলেও কার্যকর হস্তক্ষেপ করেনি। এতে পরিবারটি কার্যত জীবিকার সবকিছু হারায়।
আন্তর্জাতিক খ্রিস্টান পর্যবেক্ষক সংস্থা ওপেন ডোর্স জানায়, লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতার কারণে বহু খ্রিস্টান পরিবার আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছে। আগস্ট থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ৩৬টি নিশ্চিত হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে এবং ১০০টির বেশি পরিবারকে ধর্ম ত্যাগে চাপ দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, ভয়, সামাজিক লজ্জা ও কর্তৃপক্ষের ওপর অনাস্থার কারণে অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না।
স্থানীয় পর্যায়ে হামলা, রাষ্ট্রের নীরবতা
বিবিসি বাংলা আরও জানায়, বিভিন্ন এলাকায় খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ের নিপীড়ন চলছেই। মদনপুরে একটি খ্রিস্টান পরিচালিত ক্রেডিট সেন্টার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এক বন্দর শহরে একটি ব্যাপ্টিস্ট গির্জার সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে ময়লা ফেলা হয়েছে, গোপালগঞ্জে গির্জার জমি দখলের চেষ্টা হয়েছে বারবার। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ জানানো হলেও পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগের অভাব
১৬ নভেম্বর পোপ ফ্রান্সিস প্রকাশ্যে বাংলাদেশকে নাইজেরিয়ার সঙ্গে এমন দেশগুলোর তালিকায় উল্লেখ করেন, যেখানে খ্রিস্টানরা “নিষ্ঠুর নিপীড়নের” শিকার। কিন্তু সংখ্যালঘু নেতাদের মতে, উদ্বেগ প্রকাশের বাইরে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া খুবই সীমিত।
খ্রিস্টান নেতারা বলছেন, ইউনুস প্রশাসন উগ্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে—যাদের মধ্যে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো দল ও আগে মুক্তিপ্রাপ্ত জঙ্গিরাও রয়েছে। এই নীরবতা হামলাকারীদের সাহস জুগিয়েছে এবং দায়মুক্তিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।
বাংলাদেশ যখন নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, তখন খ্রিস্টানদের প্রধান চিন্তা রাজনীতি নয়—নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা। এক গির্জা নেতা বলেন,
“নীরবতা উগ্রবাদীদের আরও সাহসী করে তোলে। জবাবদিহিই একমাত্র জিনিস, যা প্রাণ রক্ষা করতে পারে।”