Menu
Back to timeline

ইউনুস থেকে বিএনপি: টাকা ছাপানো ও ব্যাংক ঋণের চাপে গভীরতর অর্থনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ

ইউনুস থেকে বিএনপি: টাকা ছাপানো ও ব্যাংক ঋণের চাপে গভীরতর অর্থনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনীতি, যা একসময় রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির সফল মডেল হিসেবে প্রশংসিত ছিল, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর থেকে ক্রমাগত আর্থিক চাপে নিমজ্জিত। পরবর্তী সময়ে ড. Muhammad Yunus নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং তার পরে Bangladesh Nationalist Party (বিএনপি) সরকারের গৃহীত নীতিগুলো সম্মিলিতভাবে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়েছে, ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করেছে এবং রাজস্ব ঘাটতিকে আরও তীব্র করেছে।

এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কোনো সাময়িক ধাক্কা নয়—বরং এটি একটি কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংকট, যার মূল চালিকা শক্তি হলো অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ, ব্যাংকনির্ভর ঋণগ্রহণ, এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক শৃঙ্খলার দুর্বলতা।


মুদ্রাস্ফীতি: লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি

ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং তা ২০২৬ সালের শুরুতেও উচ্চমাত্রায় অব্যাহত থাকে। খাদ্যপণ্যের দাম বিশেষভাবে বেড়েছে—যার পেছনে রয়েছে সরবরাহ ঘাটতি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি।

এই প্রবণতা বিএনপি সরকারের সময়েও থামেনি। জ্বালানি ও খাদ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে।


অন্তর্বর্তী সরকারের সময়: টাকা ছাপানোর নীতি

ড. ইউনুস সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারকে অর্থায়ন করা—যা সাধারণভাবে “টাকা ছাপানো” হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা বাজারে সরবরাহ করে সরকারি ব্যয় মেটাতে।

স্বল্পমেয়াদে এটি কিছুটা স্বস্তি দিলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল গুরুতর:

  • ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এই অর্থ বহুগুণে বৃদ্ধি পায় (ক্রেডিট মাল্টিপ্লায়ার প্রভাব)
  • বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ তৈরি হয়
  • উৎপাদন বাড়েনি, ফলে চাহিদা–সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে
  • এর সরাসরি ফল: উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি

বাস্তবে, এটি সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের “গোপন কর”—কারণ মুদ্রাস্ফীতির কারণে তাদের আয় ও সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমে যায়।


বিএনপি সরকারের সময়: ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা

২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার একটি দুর্বল অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পায়। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে তারা ব্যাংক থেকে ব্যাপক ঋণগ্রহণ অব্যাহত রাখে।

সরকারি ব্যাংক ঋণ দ্রুত ১ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এর ফলে:

  • ব্যাংকগুলো নিরাপদ মনে করে সরকারি খাতে বেশি ঋণ দেয়
  • বেসরকারি খাত, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, ঋণ পেতে সংকটে পড়ে
  • বিনিয়োগ কমে যায়
  • কর্মসংস্থান হ্রাস পায়

এটি “crowding out effect” তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।


ব্যাংকিং খাত: আগেই দুর্বল, এখন আরও ঝুঁকিতে

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বহুদিন ধরেই সমস্যাগ্রস্ত—খেলাপি ঋণ, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে। বর্তমানে খেলাপি ঋণ প্রায় ৬.৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫%।

এই পরিস্থিতিতে:

  • ব্যাংকের তারল্য সংকট বাড়ছে
  • আমানতকারীদের আস্থা কমছে
  • যেকোনো ছোট ধাক্কা বড় আর্থিক সংকটে রূপ নিতে পারে

একটি বিপজ্জনক চক্র

বর্তমান অর্থনীতি একটি “self-reinforcing cycle”-এ আটকে গেছে:

  1. সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে
  2. বেসরকারি খাত ঋণ পাচ্ছে না
  3. অর্থনীতি ধীর হচ্ছে
  4. কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার টাকা ছাপাচ্ছে
  5. মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে
  6. মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে

এই চক্র অর্থনীতিকে ক্রমাগত দুর্বল করে তুলছে।


সামনে কী?

বিএনপি সরকারের সামনে এখন সীমিত বিকল্প:

  • কঠোর নীতি নিলে → মুদ্রাস্ফীতি কমতে পারে, কিন্তু প্রবৃদ্ধি কমবে
  • বর্তমান নীতি চালালে → মুদ্রাস্ফীতি স্থায়ী হবে, মুদ্রার মান কমবে

সমাধানের পথ

অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে প্রয়োজন:

  • রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়ন সীমিত করা
  • ব্যাংকিং খাত সংস্কার
  • জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন

উপসংহার

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এটি কেবল সংখ্যার খেলা নয়—এটি মানুষের জীবনযাত্রা, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার প্রশ্ন।

পরপর দুটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অর্থনীতির ভিতকে দুর্বল করেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আস্থা পুনর্গঠন এবং সুশাসনের মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা।

প্রশ্নটি এখন শুধু অর্থনীতিবিদদের নয়—এটি প্রতিটি সাধারণ মানুষের:
বাংলাদেশ কি সাময়িক সংকটে, নাকি একটি গভীর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে?

More from the timeline

View all