নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী শাসনের ছায়ায় বাংলাদেশ আজ ভয়াবহ আইনশৃঙ্খলা বিপর্যয়ের মুখোমুখি। যেখানে আইনের শাসনের জায়গা দখল করেছে গণপিটুনি ও জনতার বিচার, যেখানে অচিহ্নিত লাশ প্রতিনিয়ত উদ্ধার হচ্ছে নদী–নালা ও জনবিরল স্থান থেকে, আর যেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়—বিশেষ করে হিন্দুরা—ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকে দেশজুড়ে সহিংসতার বিস্তার নজিরবিহীন মাত্রা পেয়েছে। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেই পরিস্থিতি ভয়াবহ চূড়ায় পৌঁছায়—গণপিটুনিতে হত্যার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়, অচিহ্নিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বাড়ে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ ভয়ঙ্কর মাত্রায় পৌঁছে যায়। একসময় দারিদ্র্য বিমোচনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ইউনুস এখন অভিযুক্ত হচ্ছেন প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অবহেলা এবং মানবজীবনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য। তার প্রশাসনের অস্বীকার ও ঘটনাগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা তথাকথিত সংস্কার সরকারের ভেতরের সংকটকেই প্রকাশ করছে।
এটি কোনো শাসনব্যবস্থা নয়—এটি দুর্বল ও নিরাপত্তাহীন মানুষের বিরুদ্ধে এক গভীর বিশ্বাসঘাতকতা।
গণপিটুনি: দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিস্তার
ইউনুসের শাসনামলে গণপিটুনি কার্যত আইনের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেই ২৮টি গণপিটুনির ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন, যা আগের মাসের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সংস্থাটি এসব ঘটনাকে সরাসরি “জনতার হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
গুজব, মিথ্যা অভিযোগ এবং দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে এসব সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। চুরি, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা কিংবা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বহু মানুষকে জনতার হাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর আহত অবস্থায় ভুক্তভোগীদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে—আইনের শাসনের জায়গায় জনতা বিচারক ও শাস্তিদাতা হয়ে উঠেছে।
শরীয়তপুরে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা এবং ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক শ্রমিককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা—এসব ঘটনা সহিংসতার ধারাবাহিকতাকে স্পষ্ট করেছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত গণপিটুনিতে ছয় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
অচিহ্নিত লাশ: রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নীরব সাক্ষী
দেশজুড়ে অচিহ্নিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এমএসএফের জানুয়ারি ২০২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই মাসেই ৫৭টি অচিহ্নিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এসব মরদেহের অনেকগুলোতেই নির্যাতনের চিহ্ন, আঘাত এবং হত্যার স্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে নদী, মহাসড়ক, পরিত্যক্ত এলাকা ও শহরের আবর্জনার স্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দ্রুত বাড়তে থাকে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই একাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং অনেক ভুক্তভোগী অচিহ্নিত অবস্থায় পড়ে থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা, অপহরণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিস্তারের প্রতিফলন।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা: ভয় ও অনিরাপত্তার পরিবেশ
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শতাধিক সংখ্যালঘু হত্যাকাণ্ড এবং শত শত সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় উপাসনালয় ভাঙচুর, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ এবং নারীর ওপর সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুতেই হামলার সংখ্যা নতুন মাত্রা পায়। মন্দির ভাঙচুর, জমি দখল এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংখ্যালঘুদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানবাধিকার সংকট ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা
মানবাধিকার সংগঠনগুলো আরও অভিযোগ করেছে যে, এই সময়ে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে, সাংবাদিক ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন ব্যবহার করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক মামলায় বিপুল সংখ্যক মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও কর্মকর্তাদের অপসারণের ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, নির্বাচন বিলম্ব, বিরোধী কণ্ঠ দমন এবং নিরাপত্তা সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
উপসংহার: জবাবদিহির প্রশ্ন
সমালোচকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার সহিংসতা, গণপিটুনি, অচিহ্নিত মরদেহ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তারা মনে করেন, দ্রুত কার্যকর আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আইনের শাসন ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা কি পুনরুদ্ধার করা যাবে, নাকি সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা আরও গভীর সংকটে রূপ নেবে।