Menu
Back to timeline

আশা থেকে বিশৃঙ্খলায়: বাংলাদেশে অস্থায়ী সরকারের এক বছর

আশা থেকে বিশৃঙ্খলায়: বাংলাদেশে অস্থায়ী সরকারের এক বছর

দীর্ঘদিনের শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে অস্থায়ী সরকারের আগমন প্রথমে অনেকের কাছে আশা জাগিয়েছিল। নাগরিকরা রাজনৈতিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনঃস্থাপন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু বাস্তবতা দেখায়, প্রত্যাশা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ফারাক।

অস্থায়ী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সাংবাদিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে, বিচারব্যবস্থা স্বতন্ত্রতা হারিয়েছে, শিক্ষা খাতে বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি বেড়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে এবং শিক্ষার্থীবাহিনী নামধারী নেতারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।

অর্থনীতি স্থবির, সংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান—মন্দির থেকে সিনেমাহল পর্যন্ত—সংকটের মুখে, এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সাংবাদিকদের স্বীকৃতি বাতিল, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি, এবং প্রশ্ন করতে ভয়—all ইঙ্গিত দেয় যে “মুক্ত সাংবাদিকতা” এখনও ফিরিয়ে আনা যায়নি।

শিক্ষাক্ষেত্রেও অস্থায়ী সরকারের অধীনে সংকট অব্যাহত। শিক্ষক নিয়োগ, পরীক্ষা পুনর্বিন্যাস, সংস্কার কমিশন গঠন হলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যক্রম সংক্ষিপ্ত করা বা সময় বাড়ানোর পরিবর্তে পরীক্ষার বাতিল, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রশাসনে শীর্ষ নেতৃত্বের পদত্যাগ এবং কর্মক্ষমতার ঘাটতি দেশে শিক্ষাক্ষেত্রকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সুযোগবাদী কর্মকাণ্ডও প্রকট। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP) এখন নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িত, ভোট ও অর্থনৈতিক নীতিতে অস্থিরতা তৈরি করছে। শিক্ষার্থী আন্দোলন নামে শুরু হওয়া সংগঠনগুলো ক্ষমতা ও অর্থের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যা শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের ক্ষতি করছে।

অর্থনীতিও সংকটাপন্ন। বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন ধীর, মুদ্রাস্ফীতি ১০.৩৪% ছুঁয়ে জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। গার্মেন্টস শিল্পে শতাধিক কারখানা বন্ধ হওয়ায় প্রায় ৬২,০০০ শ্রমিক বেকার। গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হওয়ায় দরিদ্র জনগণ আরও সংকটে।

সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাংস্কৃতিক হামলা ও গণপ্রহারে দেশজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিল্পী ও সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে সহিংসতা বেড়েছে, ফলে মিডিয়ায় আত্মসঙ্গলতা ছড়িয়েছে। পুলিশের অক্ষমতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করেছে।

সংক্ষেপে, এক বছরের অস্থায়ী সরকারী শাসন বাংলাদেশকে গভীর অনিশ্চয়তা, গণতান্ত্রিক দুর্বলতা, সাংস্কৃতিক দমন, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। দেশকে পুনরুদ্ধার করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রয়োজন। অন্যথায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ভোগ করবে।

More from the timeline

View all