আমাদের শিশুদের রক্তে লেখা নির্মম বাস্তবতা: আজকের বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়?
একটি অপ্রতিম, একটি রামিসা কিংবা একটি আসিয়া—কোনো একক শিশুর করুণ পরিণতিই বাংলাদেশে শিশু হত্যা, নির্যাতন ও নিখোঁজ হওয়ার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রতিটি নামের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একগুচ্ছ স্বপ্ন এবং বিচার ও নিরাপত্তার অপেক্ষায় থাকা একটি সমাজ।
আজকের বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে নয়, মাদ্রাসায় নয়, খেলার মাঠে নয়—এমনকি নিজেদের ঘর কিংবা পরিচিত মানুষের আশপাশেও শিশুরা কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে। নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো শিশুর মরদেহ উদ্ধার, যৌন নিপীড়নের অভিযোগ কিংবা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর যখন বারবার সামনে আসে, তখন তা আর বিচ্ছিন্ন অপরাধের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সামনে আসে আইনশৃঙ্খলা, তদন্ত, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
বিএনপি সরকারের আমলে শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা ও উদ্বেগ আরও জোরালো হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দায় নির্ধারণের জন্য অপরাধের প্রকৃত চিত্র, তদন্তের অগ্রগতি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা এবং সরকারি পদক্ষেপের তথ্যনির্ভর মূল্যায়ন জরুরি। কারণ একটি শিশুর মৃত্যু কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়—এটি একটি অপূরণীয় মানবিক বিপর্যয়।
আট মাসে ১৫৫ শিশু নিহত, নিখোঁজের তালিকায় দুই হাজারের বেশি
প্রদত্ত প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য এবং পুলিশের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ১৫৫ শিশু নিহত হয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৩৬ শিশুকে নিখোঁজ হওয়ার পর মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাদের কারও মরদেহ পুকুরে, কারও ঝোপঝাড়ে, আবার কারও মরদেহ মাটির নিচে চাপা অবস্থায় পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
একই প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তরের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে খুঁজে পাওয়া গেছে বা তারা ফিরে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, দুই হাজারের বেশি শিশুর সন্ধান তখনও পাওয়া যায়নি।
এই পরিসংখ্যানগুলোর প্রতিটি সংখ্যা একটি বাস্তব উদ্বেগের কথা মনে করিয়ে দেয়। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার যে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও অসহায়তার মধ্য দিয়ে যায়, তা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সন্তান কোথায় আছে, সে বেঁচে আছে কি না, তাকে কেউ অপহরণ করেছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয় স্বজনদের।
তবে নিখোঁজের অভিযোগ, পরে উদ্ধার হওয়া শিশু, এখনো নিখোঁজ শিশু এবং নিহত শিশুর সংখ্যা আলাদা বিষয়। এগুলোকে এক করে দেখলে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সময়সীমা, তথ্যের উৎস এবং হিসাবের পদ্ধতি যাচাই করে এসব পরিসংখ্যান প্রকাশ করা জরুরি।
তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়: এত বিপুলসংখ্যক নিখোঁজের অভিযোগের পর শিশুদের দ্রুত খুঁজে বের করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? নিখোঁজ হওয়ার পরপরই অনুসন্ধান জোরদার করা হচ্ছে কি? বিভিন্ন থানার মধ্যে তথ্য বিনিময় কতটা কার্যকর? আর যেসব শিশু নিখোঁজ থাকার পর মৃত অবস্থায় উদ্ধার হচ্ছে, সেসব মামলার তদন্ত ও বিচার কত দূর এগিয়েছে?
হাসপাতাল থেকে খেলার মাঠ—কোথায় নিরাপদ শিশুরা?
শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ভয়াবহতা বোঝার জন্য সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকানোই যথেষ্ট। কোনো কোনো ঘটনা জনমনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে, আবার কোনো কোনো ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে জনসমাগমপূর্ণ স্থান, পাড়া-মহল্লা এবং পরিচিত পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে।
সরকারি হাসপাতালেও নিরাপত্তার প্রশ্ন
প্রদত্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ১১ নম্বর শয্যা থেকে সাত মাস বয়সী মোহাম্মদ রাকিব ইসলামকে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে এক নারীকে শিশুটিকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার স্বজনেরা। সেখানে যদি শিশুর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তাহলে হাসপাতালের নজরদারি, প্রবেশ ও বের হওয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সরকারি হাসপাতাল শুধু চিকিৎসার স্থান নয়; এটি মানুষের আস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে শিশু অপহরণের মতো অভিযোগ উঠলে ঘটনার দ্রুত তদন্ত, শিশুটিকে উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি শনাক্ত করা অপরিহার্য।
খেলতে গিয়ে নিখোঁজ, পরে উদ্ধার মরদেহ
কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া এবং পরে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। একটি শিশু খেলতে বাইরে গেল, কিন্তু আর বাড়ি ফিরল না—একটি পরিবারের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ অপেক্ষা আর কী হতে পারে?
পাবনায় দোকানে যাওয়ার কথা বলে বের হওয়া ১০ বছর বয়সী এক শিশুকন্যাকে অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরে একটি পুকুর থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগে তার মরদেহ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা শুধু অপরাধের নৃশংসতা প্রকাশ করে না; এগুলো শিশুদের দৈনন্দিন চলাফেরা, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ প্রতিরোধের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে।
শিশুদের সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে আটকে রাখা কোনো সমাধান হতে পারে না। বরং এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তারা নিরাপদে খেলতে পারবে, স্কুলে যেতে পারবে এবং প্রয়োজনে আশপাশের মানুষের সাহায্য চাইতে পারবে।
পরিচিত বাড়ি কিংবা প্রতিবেশীর কাছেও কি নিরাপদ নয় শিশুরা?
জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছর বয়সী এক শিশুকন্যাকে সহপাঠীর বাড়িতে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া, সেখানে যৌন নিপীড়ন ও হত্যার পর মাটির মেঝের নিচে মরদেহ পুঁতে রাখার অভিযোগ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
বাগেরহাটে নয় বছর বয়সী রাফি আকনের নিখোঁজ হওয়া এবং দুই দিন পর কাছের একটি খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পাবনায় কামরুন্নাহার কলি নামের ১০ বছর বয়সী এক শিশুকন্যা নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর একটি বস্তায় ভরা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে স্থানীয় এক দোকানির বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে সাত বছর বয়সী মিম নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর একটি পুকুরের পাশের ঝোপ থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এবং অভিযুক্তের ফ্ল্যাট থেকে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে ওই মামলায় দ্রুত বিচারিক পদক্ষেপ ও মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব ঘটনার প্রতিটি বিবরণ সংশ্লিষ্ট সংবাদ, মামলা ও আদালতের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগগুলোর প্রকৃতি একটি বড় উদ্বেগ সামনে আনে: শিশুদের প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে অপরাধী অনেক সময় অপরিচিত কেউ নয়, বরং প্রতিবেশী, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা শিশুটির আশপাশের কেউ হতে পারে।
এ কারণেই শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব কেবল বাবা-মায়ের সতর্কতার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। পরিবারকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত, দ্রুত প্রতিক্রিয়া, নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অপরাধীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধারে প্রথম কয়েক ঘণ্টাই গুরুত্বপূর্ণ
কোনো শিশু নিখোঁজ হলে পরিবারের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। শিশুটি কোথায় গেছে, কার সঙ্গে ছিল, সর্বশেষ কোথায় দেখা গেছে—এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করা এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, যোগাযোগের তথ্য ও সম্ভাব্য অবস্থান যাচাই করা জরুরি।
কিন্তু কোনো কোনো পরিবার অভিযোগ করে, নিখোঁজের পরপরই তারা প্রত্যাশিত সহায়তা পায় না। কোথাও সাধারণ ডায়েরি করার পর অপেক্ষা করতে হয়, কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে নিজেরাই সন্তানকে খুঁজতে থাকেন স্বজনেরা। এমন অভিজ্ঞতা যদি ঘটে থাকে, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা এবং প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নিখোঁজ শিশুর অনুসন্ধানে দেরি হলে সম্ভাব্য ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ, দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন, আন্তঃথানা সমন্বয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দেশব্যাপী সতর্কতা জারি করার ব্যবস্থা থাকা দরকার।
প্রতিবেদনে ‘মিসিং চাইল্ড অ্যালার্ট’ বা শিশু নিখোঁজসংক্রান্ত সতর্কতা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এমন ব্যবস্থার সাফল্য শুধু কতটি সতর্কবার্তা জারি হয়েছে বা কত শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কতটি ঘটনা সময়মতো শনাক্ত হয়েছে এবং কোন ঘাটতিতে উদ্ধার ব্যাহত হয়েছে—এসব তথ্যও জনসমক্ষে থাকা উচিত।
অপরাধীরা কেন আইনের ভয় পাবে না?
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। অপরাধের ঝুঁকি কমানো, অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচকদের বক্তব্যে তিনটি বড় দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে।
প্রথমত, পুলিশি অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি বা অন্যান্য দায়িত্বের চাপে কমিউনিটি পুলিশিং, টহল এবং অপরাধ প্রতিরোধের কাজ উপেক্ষিত হচ্ছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। শিশুদের নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয় হতে পারে না; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, জরুরি প্রতিক্রিয়ায় ঘাটতি। নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করা, বিভিন্ন থানার তথ্য একত্র করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে দেরি বা সমন্বয়ের অভাব থাকলে তার কারণ শনাক্ত করে দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, তদন্ত ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা। কোনো অপরাধের বিচার বিলম্বিত হলে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পেতে বাধার মুখে পড়ে। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়ানোর অর্থ ন্যায্য তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার উপেক্ষা করা নয়। বরং দক্ষ তদন্ত, ফরেনসিক সক্ষমতা, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং আদালতের পর্যাপ্ত সক্ষমতার মাধ্যমে দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই, যখন অপরাধীর পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক সংযোগ যা-ই হোক, আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়।
আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর?
শিশুদের সুরক্ষায় আইন ও বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। কাগজে আইন থাকা আর বাস্তবে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়।
কোনো শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কত দিনে শেষ হচ্ছে? অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করা যাচ্ছে কি? ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা ও মানসিক সমর্থনের ব্যবস্থা আছে কি? আদালতের রায় কার্যকর হচ্ছে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার।
অভিযুক্তের বাড়িতে হামলা কিংবা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ঘটনা জনমনে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু গণপিটুনি বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়। এতে নিরপরাধ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এবং প্রকৃত অপরাধের তদন্তও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো জনরোষের কারণগুলো আমলে নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্তের অগ্রগতি, অভিযোগপত্র, বিচারাধীন মামলা, রায় এবং সাজা কার্যকরের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে জনসাধারণ যেমন পরিস্থিতি বুঝতে পারবে, তেমনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিও বাড়বে।
বিএনপি সরকারের কাছে কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন
বিএনপি সরকার আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে—এমন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর স্পষ্ট জবাব দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
সরকারের কাছে প্রশ্ন: নিখোঁজ শিশুদের অনুসন্ধানে কী ধরনের জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? থানাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় কীভাবে উন্নত করা হচ্ছে? হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা ও শিশুদের বিনোদনস্থলে নিরাপত্তা জোরদারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? শিশু হত্যা ও যৌন নির্যাতনের মামলাগুলোর তদন্ত এবং বিচার দ্রুত এগিয়ে নিতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব উদ্যোগের ফলাফল কী? কতটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর উদ্ধার হয়েছে, কতটি ঘটনায় অপরাধের অভিযোগের তদন্ত শেষ হয়েছে এবং কতটি মামলায় বিচার সম্পন্ন হয়েছে—এসব বিষয়ে হালনাগাদ, যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা উচিত।
শুধু উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা তুলে ধরে সাফল্য দাবি করলে চলবে না; যেসব শিশুকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি, যেসব পরিবার উত্তর পায়নি এবং যেসব মামলার বিচার ঝুলে আছে, তাদের প্রতিও রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব রয়েছে।
শিশুদের নিরাপত্তা কোনো দলের নয়—সমগ্র রাষ্ট্রের দায়িত্ব
শিশু হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্র কতটা মানবিক, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো—সে তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে।
যে শিশু স্কুলে যাওয়ার পর বাড়ি ফেরে না, যে শিশু খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয়, যে শিশু পরিচিত কারও বাড়িতে গিয়ে আর ফিরে আসে না—তার পরিবারের কাছে রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে জরুরি হলো সত্য জানা, সন্তানকে ফিরে পাওয়া এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
অপ্রতিম, রামিসা, আসিয়া কিংবা অন্য যেসব শিশুর নাম এমন মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তাদের স্মৃতি যেন কেবল কয়েক দিনের সংবাদ শিরোনামে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের আইন অনুযায়ী বিচার এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। বিরোধী দল, মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং স্থানীয় সমাজ—সব পক্ষকেই এই সংকট মোকাবিলায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
শিশুদের জীবন রক্ষা করা কোনো সরকারের অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। নিখোঁজ শিশুর পরিবারকে অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখা, অপরাধের তদন্তে অযৌক্তিক বিলম্ব কিংবা জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া—কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়।
আজ বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি শুধু কতজন শিশু নিখোঁজ হয়েছে বা কতজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো—আর কোনো পরিবারকে যেন এমন অসহনীয় পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য রাষ্ট্র কী করছে?
শিশুরা নিরাপদ না হলে কোনো সমাজই নিরাপদ নয়। আর শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতার জবাব সরকারকে দিতেই হবে।