Menu
Back to timeline

“আমরা পরাজয় মানি না”

“আমরা পরাজয় মানি না”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এর ঐতিহাসিক ভাষণ**

প্রথমেই আমি স্মরণ করছি আমার বাংলাদেশের সেই শহীদ ছাত্রদের, শ্রমিকদের, কৃষকদের, বুদ্ধিজীবীদের, সেনা ও পুলিশ সদস্যদের, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সেই সব মানুষকে—যারা প্রাণ দিয়েছেন আমাদের স্বাধীনতার জন্য। তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

আজ আমার বাংলাদেশ স্বাধীন। আমার জীবনের সাধনা পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ মুক্ত হয়েছে। এই স্বাধীনতা চিরস্থায়ী হবে। আজ আমি পুরোপুরি ভাষণ দিতে পারব না—কারণ এই মুক্তি এসেছে অসীম ত্যাগের বিনিময়ে। বাংলার মা, বাংলার সন্তান, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা সংগ্রাম করেছে। আমি কারাগারে ছিলাম, ফাঁসির মঞ্চের জন্য প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু আমি জানতাম—আমার বাঙালিদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।

আমাকে জানানো হয়েছে—প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। এত বিপুল সংখ্যক নিরীহ মানুষ প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও নিহত হয়নি, যতটা হয়েছে সাত কোটি মানুষের এই বাংলাদেশে।

আমি জানতাম না, আমি আপনাদের কাছে ফিরতে পারব কি না। আমি শুধু বলেছিলাম—আমাকে যদি হত্যা করতেই হয়, তবে আমার মৃতদেহ যেন আমার বাঙালিদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়।

আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই ভারতের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীকে। ধন্যবাদ জানাই সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও বিশ্বের সেই সব দেশ ও জনগণকে, যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছে। ধন্যবাদ জানাই বিশ্বের সকল নিপীড়িত মানুষকে।

এক কোটি বাঙালি ঘরছাড়া হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার তাদের খাদ্য ও আশ্রয় দিয়েছে। এই মানবিক সহায়তার জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ।

তবে মনে রাখতে হবে—বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। কেউ বাংলাদেশকে দমন করতে পারবে না। ষড়যন্ত্র করে কোনো লাভ নেই।

আমি আগেই বলেছিলাম—
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
আমি বলেছিলাম—“প্রতিটি ঘরকে দুর্গে পরিণত করো।”
আপনারা তাই করেছেন।

আজ আমি আমার সোনার বাংলা, বাংলার আকাশ, মাটি ও মানুষকে সালাম জানাই। সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি—এই ভালোবাসাই আমাকে ফিরিয়ে এনেছে।

বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের কাছে আমি আবেদন জানাই—আমাদের ঘর নেই, খাবার নেই, রাস্তা নেই, বন্দর নেই। মানবতার খাতিরে আমার মানুষকে সাহায্য করুন। জাতিসংঘের কাছে আমি সাহায্য চাই এবং অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানাই।

আমরা পরাজয় মানি না। আমরা পরাজয় চিনিই না।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—
“সাত কোটি বাঙালিরে হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।”

আজ বাঙালিরাই প্রমাণ করেছে—এই কথা ভুল। এত ত্যাগ, এত আত্মবলিদান পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

আজ থেকে আমি নেতা হিসেবে নয়—আপনাদের ভাই হিসেবে বলছি:
যদি বাংলার মানুষ পেটভরে খেতে না পারে, এই স্বাধীনতা অর্থহীন।
যদি বাংলার মা-বোন কাপড় না পায়, এই স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ।
যদি যুবসমাজ কর্মসংস্থান না পায়, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ।

চুরি-ডাকাতি, লুটপাট বন্ধ করতে হবে।
বাংলায় বসবাসকারী অ-বাঙালিদের বলছি—আপনারাও বাঙালি হন। তাদের ওপর হাত তুলবেন না। আমরা মানুষ, আমরা মানুষকে ভালোবাসি।

কিন্তু যারা খুন করেছে, ধর্ষণ করেছে, ঘরে ঘরে আগুন দিয়েছে—তাদের বিচার হবেই। স্বাধীন বাংলাদেশের আদালতেই বিচার হবে। কেউ রেহাই পাবে না।

বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।

ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে—যেদিন আমি বলব। ইন্দিরা গান্ধী সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু করেছেন।

আমি প্রতিশোধ চাই না। আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। বিচার হবে রাষ্ট্রের মাধ্যমে।

চলুন আমরা একসাথে নতুন বাংলাদেশ গড়ি—
যেখানে মানুষ হাসবে,
মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেবে,
দিনে দুই বেলা খাবার পাবে।

এই স্বপ্ন বাস্তবায়নই আমার জীবনের লক্ষ্য।

ভাই ও বোনেরা,
আমার জন্য দোয়া করবেন।
আল্লাহ আমাদের সহায়।
যতদিন বাংলাদেশের একজন মানুষও বেঁচে থাকবে—
এই স্বাধীনতা অটুট থাকবে।

জয় বাংলা।
জয় স্বাধীন বাংলাদেশ।


লেখক:
প্রফেসর রশিদ আসকারী
সাবেক উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

More from the timeline

View all