Menu
Back to timeline

আবারও বিজয় দিবসে নেই কুচকাওয়াজ: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলছেন কি ড. ইউনুস?

আবারও বিজয় দিবসে নেই কুচকাওয়াজ: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলছেন কি ড. ইউনুস?

দুই বছর ধরে কুচকাওয়াজবিহীন বিজয় দিবস

দ্বিতীয় বছরের মতোই বাংলাদেশে বিজয় দিবস কোনো কুচকাওয়াজ ছাড়াই পালিত হতে যাচ্ছে। ১৬ ডিসেম্বর—যেদিন রাস্তাজুড়ে থাকে মানুষের ঢল, বিজয়ীর পদচারণা, বীর শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা—সেই দিনটিই এখন নিস্তব্ধ। নেই সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক মার্চপাস্ট, নেই জাতীয় গর্বের কোন আনুষ্ঠানিকতা।

কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই, তবু কুচকাওয়াজও নেই—এই সিদ্ধান্ত মোটেই সাধারণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়। বরং এটি ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ—যেখানে তারা যেন পরিকল্পিতভাবেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও প্রতীকগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

ইতিহাস মুছে ফেলার নিয়মিত প্রচেষ্টা

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর ক্ষমতায় আসা এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত দিনগুলো একে একে বাতিল বা অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। ৭ মার্চ—জাতির পিতার ঐতিহাসিক ভাষণের দিন, ১৭ মার্চ—বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, ১৫ আগস্ট—জাতীয় শোক দিবস, ৪ নভেম্বর—সংবিধান দিবস—সবগুলোই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এসব সিদ্ধান্ত কেবলই একটি দিন বাতিল করা নয়, বরং জাতির পরিচয় গঠনে যে ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো ভিত্তি হয়ে আছে—সেগুলোকে ধীরে ধীরে জনসচেতনতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল। প্রতিটি বাতিলকৃত দিন আমাদের জাতীয় স্মৃতিকে আরেকটু ক্ষয়ে দেয়।

প্রতীক ও স্মৃতির বিরুদ্ধে আঘাত

নির্দেশে নির্দেশে সরকারি অফিস, প্রতিষ্ঠান, মুদ্রা ও বিভিন্ন জনসমক্ষে থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি ও ভাস্কর্য অপসারণ করা হয়েছে। বহু শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ও মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক ভাস্কর্য ভাঙচুর, অবহেলা বা ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করার ঘটনা ঘটেছে।

এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা পরিবর্তন ও বঙ্গবন্ধুর "জাতির পিতা" উপাধি বাতিল করে দেশের প্রতিষ্ঠার মূল বয়ানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। এগুলো কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সংশোধন নয়—এগুলো সুস্পষ্টভাবে ইতিহাস পুনর্লিখনের রাজনৈতিক পদক্ষেপ।

ড. ইউনুসের ‘রিসেট বাটন’: আসলে কী রিসেট হচ্ছে?

ড. ইউনুস তাঁর তথাকথিত “রিসেট বাটন”-এর কথা বলে এটিকে দুর্নীতি দমনের পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—কুচকাওয়াজ বাতিল, জাতীয় দিবস বাতিল, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক অপসারণ—সবকিছুই অতীতের পাকিস্তানি শাসকদের পথ অনুসরণ করার মতোই এক রাজনৈতিক প্রকল্প।

যাদের সমর্থনে সরকার চলছে—ইসলামপন্থি ও পাকিস্তানপন্থি গোষ্ঠী—তাদের বহু নেতা ও অংশগ্রহণকারী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী। তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দুর্বল করা শুধু সুবিধাজনক নয়, বরং রাজনৈতিক লক্ষ্য।

এটি কোনো নিরপেক্ষ “রিসেট” নয়—এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ধ্বংস করে অন্য বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

কুচকাওয়াজ কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ কেবল একটি শোভাযাত্রা নয়; এটি জাতীয় স্মৃতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভ।
এটি—

  • আমাদের সামরিক বিজয়কে স্মরণ করায়

  • শহীদদের ত্যাগকে সম্মান জানায়

  • নতুন প্রজন্মকে ১৯৭১-এর ইতিহাস শেখায়

  • জাতিকে একত্রিত করে

যখন এই কুচকাওয়াজ বাতিল করা হয়—তা শুধু একটি অনুষ্ঠানের অনুপস্থিতি নয়, বরং একটি জাতীয় অনুশীলন থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা। এতে তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধ থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে যায়।

এটাই হয়তো বর্তমান সরকারের লক্ষ্য—জাতির আত্মপরিচয়কে দুর্বল করা, যেন ১৯৭১ আর অতটা গুরুত্বপূর্ণ না মনে হয়।

শেষ কথা

যে সরকার দুই বছর ধরে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ বন্ধ রাখে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক সরায়, জাতীয় বীরদের অস্বীকার করে—সেই সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্ট। তারা ইতিহাসকে নিঃশব্দে মুছে ফেলছে।

বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজের অনুপস্থিতি তাই শুধু রাস্তায় নয়—এই জাতির হৃদয়ে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করছে।
এটি সময়োপযোগী সতর্কবার্তা: যদি আমরা এখনই ইতিহাস রক্ষায় দাঁড়াতে না পারি, তবে আগামী প্রজন্ম আর কখনোই সত্যিকারের ১৯৭১-কে জানতে পারবে না।

More from the timeline

View all