বাংলাদেশে জমি দখল, রাজনৈতিক ভয়ভীতি ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ নতুন করে আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। রাজনৈতিক পরিচয়ই যদি কারও সম্পদ ও নিরাপত্তা নির্ধারণ করে, তাহলে সাধারণ নাগরিকের অধিকার রক্ষা করবে কে?
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে জমি দখল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠছে। এসব অভিযোগের মধ্যে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার কথা বলা হচ্ছে—কাউকে ‘আওয়ামী লীগের লোক’ হিসেবে চিহ্নিত করা, তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করা, সংঘবদ্ধ লোকজন দিয়ে হামলা চালানো এবং শেষ পর্যন্ত তার সম্পদ বা প্রতিষ্ঠানের দখল নেওয়া।
অভিযোগগুলো সত্য হলে, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিষয় নয়; বরং আইনের শাসন, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার এবং নাগরিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। রাজনৈতিক পরিচয়কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কেউ যদি জোরপূর্বক অন্যের সম্পদ দখল করতে পারে, আর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে তাই মৌলিক প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আইন কি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়?
ঢাকায় তিন রাতের ঘটনা: একই ধরনের উদ্বেগ, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট
২০২৬ সালের ২৪ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ঘটে যাওয়া তিনটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাব, সংঘবদ্ধ হামলা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঘটনাগুলোর প্রকৃতি এক নয়। তবে প্রতিটিই নাগরিকের সম্পত্তি, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং আইনগত সুরক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।
১. মিরপুর-১-এর রাড্ডা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যকেন্দ্র: সেবা প্রতিষ্ঠান দখলের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে মিরপুর-১-এ অবস্থিত রাড্ডা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি হামলা চালায়। পাঁচ দশকের কাছাকাছি সময় ধরে দরিদ্র মানুষের জন্য মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করে বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
হামলাকারীরা ওষুধ, সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) টিকা, আলট্রাসাউন্ড যন্ত্র, জেনারেটর, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন নথিপত্র লুট করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে একটি স্থায়ী ও তিনটি আধা-স্থায়ী ভবন ভেঙে ফেলার অভিযোগও ওঠে। ঘটনাস্থলে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয় বলে উল্লেখ রয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেড় কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের খবরও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়ায় দায় প্রমাণিত হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন হলো—একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এত বড় হামলা কীভাবে ঘটল? পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও যদি লুটপাট ও ভবন ভাঙচুর ঠেকানো না হয়ে থাকে, তাহলে সেই নিষ্ক্রিয়তার ব্যাখ্যা কী?
২. ইসিবি চত্বরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও: জমি বিরোধের নিষ্পত্তি কি মব-সন্ত্রাসে?
২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ইসিবি চত্বরের নিউ জিনি প্রপার্টিজ কমপ্লেক্সে অবস্থিত কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলার অভিযোগ ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই ট্রাকভর্তি লোকজন সেখানে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। হামলায় প্রায় এক কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত বা লুট হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে হামলার পটভূমি হিসেবে তুলে ধরা হলেও, কোনো বিরোধের বৈধ সমাধান কখনোই সংঘবদ্ধ হামলা, ভাঙচুর বা জোরপূর্বক সম্পদ দখল হতে পারে না। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এখানে প্রশ্নটি স্পষ্ট: জমি বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে তার নিষ্পত্তি হবে আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ায়, নাকি যে পক্ষ বেশি লোক জড়ো করতে পারবে, তারাই নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে?
৩. গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়: রাজনৈতিক সভা, হামলা ও গণগ্রেপ্তারের অভিযোগ
২৬ সেপ্টেম্বর গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নির্ধারিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদের সভা চলাকালে যুবদলের কর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা ও অংশগ্রহণকারীদের অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ ওঠে। এরপর পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী সন্দেহে প্রায় ৩০০ জনকে আটক করে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পরে অধিকাংশকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে ২৭ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। জাসদ কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই পুলিশকে সভার বিষয়ে জানিয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযানকে ‘আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের’ বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
এই ঘটনা রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, নির্বিচার আটক এবং আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কোনো ব্যক্তি নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত—এমন সন্দেহ থাকলেই কি যথাযথ আইনি ভিত্তি ছাড়া তাকে আটক করা যায়? আর কোনো সমাবেশে হামলার অভিযোগ উঠলে, হামলাকারীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার দায়িত্ব কার?
তিনটি ঘটনার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, এগুলো সম্মিলিতভাবে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করছে, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে অধিকার ও নিরাপত্তার মানদণ্ডও বদলে যাচ্ছে?
রাজধানীর বাইরেও জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
ঢাকার এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে বৃহত্তর সমস্যার মাত্রা আড়ালে থেকে যেতে পারে। বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল, চাঁদাবাজি, জমি নিয়ে বিরোধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর মতো অঞ্চলসহ বিভিন্ন শহর ও উপজেলা পর্যায়েও এমন অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েকটি প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক:
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: স্থানীয় প্রভাবশালীদের দাবি করা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কোনো ব্যবসায়ীকে ‘আওয়ামী লীগের লোক’ হিসেবে চিহ্নিত করে চাপ সৃষ্টি, ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বসতবাড়ি ও ব্যক্তিগত জমি দখল: অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে উচ্ছেদের হুমকি, রাতের বেলায় সম্পত্তিতে হামলা, পানি-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চাপ এবং শারীরিক হুমকির অভিযোগও সামনে এসেছে।
শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও কমিউনিটি সেন্টারের পরিচালনা পর্ষদকে চাপ বা সংঘবদ্ধ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বসানোর অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় বিরোধ কিংবা অতীতের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি দখল বা তার ওপর সহিংসতা চালানোর বৈধতা তৈরি করতে পারে না।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ: দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ে উদ্বেগ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলীর মতো বড় বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার, জলমহাল, বালুমহাল, কেবল নেটওয়ার্ক এবং বর্জ্য সংগ্রহের মতো খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
কিশোরগঞ্জে একটি জলমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৫০ জনের বেশি আহত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সময়ে মোহাম্মদপুর ও আদাবরে বাড়ি ও কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাকে ক্ষমতাসীন দলের জন্য ‘অশুভ সংকেত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং দলজুড়ে শুদ্ধি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এসব অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণের তাৎপর্য হলো, রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি রক্ষার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অপরাধ প্রতিরোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগের নামে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
‘আমার একটি পরিকল্পনা আছে’: উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, নাকি জবাবদিহির পরীক্ষা?
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তারেক রহমান ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার পর পূর্বাচলে এক জনসভায় ‘আমার একটি পরিকল্পনা আছে’ বলে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছিলেন।
কোনো রাজনৈতিক নেতার পরিকল্পনার মূল্যায়ন অবশ্যই তাঁর বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব কাজের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। নাগরিকের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার, ব্যবসা পরিচালনার স্বাধীনতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ—এসব ক্ষেত্রেই সরকারের কার্যকারিতা যাচাই করা যায়।
যদি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জমি দখল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেও কার্যকর তদন্ত না হয়, যদি হামলার শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার না পান, কিংবা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রশ্নের জবাব না মেলে, তাহলে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি জনমনে আস্থা তৈরি করতে পারবে না।
তবে এসব ঘটনা থেকে পুরো সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সরাসরি অপরাধে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। একইভাবে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অভিযোগকে উড়িয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, প্রকাশ্য জবাবদিহি এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
জননিরাপত্তা যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে
রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও অধিকার রক্ষা করা। কোনো ব্যক্তি ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক, বিরোধী দলের কর্মী, নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযুক্ত, কিংবা সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ—আইনের চোখে তাঁর মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকার কথা।
‘আওয়ামী লীগ’ পরিচয়কে যদি কাউকে সন্দেহভাজন, শাস্তিযোগ্য কিংবা সম্পত্তি হারানোর উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করার হাতিয়ার বানানো হয়, তাহলে তা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক ট্যাগের ভিত্তিতে নয়।
একইভাবে, জমি দখল বা চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপি বা অন্য কোনো দলের নেতা-কর্মীর নাম এলে, তদন্তের আগেই তাদের অপরাধী ঘোষণা করা উচিত নয়। কিন্তু দলীয় পরিচয় তাদের আইনি জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কারণও হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ও বাংলাদেশের আইনের শাসন
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদার, উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার দাবি উঠছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর সম্পত্তি দখল বা রাজনৈতিক সহিংসতাকে ‘স্বাভাবিক উত্তেজনা’ হিসেবে উপেক্ষা করলে তা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও সংকুচিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উচিত নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট প্রশ্ন তোলা:
১. জমি দখল, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগগুলো কতটা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে?
২. হামলায় জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে রয়েছে, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে কি আইনের আওতায় আনা হচ্ছে?
৩. ভুক্তভোগীরা কি নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারছেন এবং তাঁদের সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের কার্যকর আইনি সুযোগ পাচ্ছেন?
৪. পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে কি স্বাধীন তদন্ত ও যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে?
৫. রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কি আইনগত প্রক্রিয়া, ন্যায্য বিচার এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে?
এ ধরনের প্রশ্ন তোলার অর্থ কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি সমর্থন জানানো নয়। বরং এটি বাংলাদেশের জনগণের অধিকার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ।
শেষ কথা: রাজনৈতিক ট্যাগ নয়, আইনের শাসনই হোক শেষ কথা
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা—রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে কি বিচার ও জবাবদিহির মানদণ্ডও বদলে যাবে, নাকি রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য সমান আইন নিশ্চিত করবে?
মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইসিবি চত্বরের স্টুডিও এবং গুলিস্তানের জাসদ কার্যালয় ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের দাবি রাখে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি দখল, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগেরও যথাযথ অনুসন্ধান প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হলে তারও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
তারেক রহমানের সরকার যদি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও আইনের শাসনভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে থাকে, তাহলে সেই অঙ্গীকারের পরীক্ষা হবে মাঠপর্যায়ে—থানায়, আদালতে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, জমির মালিকানায় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তায়।
কোনো রাজনৈতিক পরিচয় যেন জমি দখলের অনুমতিপত্র না হয়। কোনো দলীয় প্রভাব যেন পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত না হয়। আর কোনো নাগরিক যেন রাজনৈতিক ট্যাগের কারণে নিজের সম্পদ, নিরাপত্তা কিংবা ন্যায়বিচারের অধিকার হারিয়ে না ফেলেন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাজনৈতিক প্রতিশোধের চক্র নয়, বরং এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার ওপর—যেখানে ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিক, সরকারপক্ষ ও বিরোধীপক্ষ, সবাই আইনের কাছে সমান।